.....
Showing posts with label আমার লেখা. Show all posts
লঞ্চ ভ্রমন
এখন বর্ষাকাল। যার ফলে ট্রলারে করে ভ্রমনের মধ্যে আলাদা একটা আনন্দ আছে। তাছাড়া আমাকে লঞ্চঘাটে যাবার জন্য ট্রলারে করেই যেতে হবে। বিকল্প কোন ব্যবস্থা নেই। ট্রলার ঘাট খুজতে গিয়েই লাগল বিপত্তি। কর্তৃপক্ষ তিন তিনটা ট্রলার ঘাটের সূচনা করেছে। যাক অবশেষে পাওয়া গেল কাঙ্খিত ট্রলার ঘাটটি। আমার প্রথম গন্তব্য হচ্ছে কালিরবাজার। যেখানে লঞ্চঘাট অবস্থিত। আমি যে ট্রলারে করে কালিরবাজার যাব সেটি দেখতে অনেকটা ইন্ডিয়ান ছোট আকৃতির ক্যানুর ন্যায়। যার দু মাথা চোখা মধ্যখান স্ফিত। তো উঠে বসলাম তাতে। আর হ্যা ট্রলারের কিন্তু কোন ছাউনি নেই। কী কারনে এ ব্যবস্থা বুঝতে পারলাম না । এটা কতৃপক্ষের নীর্বুদ্ধিতা নাকি ভুল, ঠিক বুঝতে পারলাম না। এটা বলছি এ কারনে যে, ভোরের দিকেই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আর আকাশ মেঘলা থাকায় যেকোন মুহূর্তে বৃষ্টির আশংখা করা অমূলক কিছু নয়।
যাই হোক ঠিক সাড়ে দশটায় সাতাশ জন যাত্রী নিয়ে আমাদের ট্রলারটি রওনা দিল। যার ধারন ক্ষমতা ছিল মাত্র বিশ জন। তাও সর্বোচ্চ। এই অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কুফল আমরা শীঘ্রই টের পেলাম। ট্রলারের বিভিন্ন স্থান থেকে পানি উঠতে লাগল। আসলে ঠিক কয়টা যায়গা থেকে পানি উঠেছিল সেটা আমি নির্ণয় করতে না পারলেও নিজের চোখে তিন চারটি উৎস থেকে প্রত্যক্ষ করলাম। একজন পানি সেচতে সোচ্চার হল। এই কাজটির জন্যই হয়ত পরবর্তীতে আমরা ট্রলার ডুবির হাত থেকে রেহাই পেলাম। সবই মহান আল্লাহ তা'আলার কুদরত। পানি কেটে কেটে চলছে আমাদের ট্রলার।
আশেপাশের গ্রাম্য-প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলোর বর্ণনা না দিলেই নয়। আকাশ মেঘলা। কোথাও কালো আবার কোথাও সাদা। চকের মাঝে দ্বীপের মত কয়েকটা বাড়ী দেখা যাচ্ছে। আশেপাশের অস্বচ্ছ ঘোলাটে পানিতে কচুরিপানার আধিক্য চোখে পড়ার মত। এই কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে হাস নামক গৃহপালিত পাখিটি নিজের খাদ্য খুজছে অবিরাম ধারায়। একবার ডুব দেয় তো আবার ভেসে উঠে। আবার ডুব আবার ভেসে উঠা। ডুব-ভাসা, ডুব-ভাসা চলছেই। আমাদের ট্রলার চালককে কিছুটা অদক্ষ বলতে হবে। বর্ষাকাল বিধায় তিনি আসল দিক নির্দেশনা ভুলে গেছেন। একজন দক্ষ চালকের ক্ষেত্রে যা কখনও কল্পনাই করা যায় না। তো তিনি এখানে সেখানে আবোল তাবোল ট্রলার ঘুরিয়ে অনেক বিলম্ব করে কালিরবাজারে পৌছালেন। আমরাও ট্রলারের মটরের একটানা গর-গর আওয়াজ থেকে রক্ষা পেলাম।
কালিরবাজার পা রেখে সবাই হাফ ছেড়ে বাচল যেন। নির্ধারিত দশ টাকা ভাড়া দিলাম ট্রলারের চালকের হাতে। এবার অপেক্ষা লঞ্চ আসার। লঞ্চ টার্মিনালে দেখলাম দুজন পুলিশ তাদের নির্ধারিত বা নির্দেশিত দায়িত্ব পালন করছে। নাহ্ দেশটাকে এখন দেশ বলা যায়। অবশেষে দীর্ঘ একঘন্টা পর লঞ্চ এল তার জন্য নির্ধারিত সময়ের পনের মিনিট বিলম্ব করে। লঞ্চ দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ। কথা ছিল আসবে বড় লঞ্চ। যার টাইটেল এম.ভি.......... এরকম টাইপের। কিন্তু একি! এযে একেবারেই ছোট লঞ্চ।
বড় লঞ্চ ভ্রমনের আশা আজকের জন্য আমার ত্যাগ করতে হল। লঞ্চে উঠলাম। লঞ্চ দোতলা। নীচে সাধারন যাত্রীদের আসন আর উপরে বিলাস। বিলাসে ঢুকলাম। কাঠের ফ্রেমে লেখা "বিলাসের ভাড়া দেড়গুন"। হ্যা, এই তাহলে বিলাসের নমুনা ! সাধারনত আমরা স্কুলে যে বেঞ্চিতে বসতাম অনেকটা সেরকম বেঞ্চিই এখানে সাড়িবদ্ধভাবে সাজানো। এক বেঞ্চে দুজন। নিজের ব্যাগ বা লাগেজ ফ্লোরে রাখতে হয় অথবা পায়ের উপর রাখতে হয়। ফ্লোর নোংরা। আমি আমার ব্যাগটা পায়ের উপরেই রাখলাম। আমাদের লঞ্চ চালকের বয়স আনুমানিক পয়ষট্টি। যৌবনকালে দেহের চামড়া সাদাই ছিল। কালে কালে রোদের তাপে তা তামাটে রূপ ধারন করেছে। চেহারায় রূক্ষতার ছাপ স্পষ্ট। তিনি দৃঢ়ভাবে চালকের আসনে বসে আছেন। মনে হচ্ছে তিনি অনেক বড় একটি জাহাজের নাবিক।
লঞ্চ ছাড়া হল। এগিয়ে চলছি আমরা। আশেপাশের প্রকৃতিক দৃশ্যাবলী মুগ্ধ করার মত। যার বর্ণনা আমি দেব না কারন লঞ্চে বসে এত কথা লেখা যায় না। আশেপাশের হকারদের চিত্কার, যাত্রীদের কথোকপোথনের ফলে বারবারই চোখ তুলে তাকাতে হয়। যার ফলে মনোযোগে ছেদ পড়ে। লঞ্চ এতক্ষনে চলে এসেছে প্রথম স্টেশনে। ও হ্যা, বলাই হয়নি। মতলব যেতে হলে একে একে ৯টি লঞ্চ টার্মিনাল অতিক্রম করতে হয়। লঞ্চ একে একে অতিক্রম করল (প্রথম থেকে) শ্রীরায়েরচর, দূর্গাপুর, নন্দলালপুর, নায়েরগাঁও, শাহপুর, শ্যামপুর, টরকী, লক্ষীপুর ও এনায়েতনগর। তার পরেই মতলব (জেলা - চাঁদপুর)। মানে আমার গন্তব্যস্থল।
আশেপাশের দুপাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী শুধু উপভোগই করা যায়। হালকা সবুজ আর গাঢ় সবুজের কারসাজি। সূর্যের আলোতে প্রখরতা নেই কারন আকাশ মেঘলা। পাখিদের আনাগোনাও তেমন লক্ষ্যনীয় নয়। তবে সবকিছু ছাপিয়ে সর্ব প্রথমেই দৃষ্টিগোচর হয় টাওয়ারগুলো। হ্যা, মোবাইল কোম্পানীগুলোর টাওয়ার। আশেপাশের সকল গাছপালাকে ছাড়িয়ে এসকল টাওয়ারগুলো অনেক উপরে উঠে গেছে। লঞ্চ যখন মতলব টার্মিনালে ভিড়ল তখন ঘড়িতে সময় দুপুর আড়াইটা। তারপর আমি কিভাবে কোথায় গেলাম সেটা বলছি না। কারন অজানাই থাক। আর হ্যা, তারিখটি ছিল ২৪শে জুলাই ২০০৭।
জুলাই ২৪, ২০০৭। লঞ্চে বসে লেখা হয়েছে।
Tag :
আমার লেখা,
ভ্রমন কাহিনী
সাইবার ক্রাইম (স্বরচিত গল্প)
ছেলেটির নাম ড্যানিয়েল মরফি। ডাকনাম ড্যান। বয়স মাত্র পনের বৎসর। বাবা একজন উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী। মা একটি প্রাইভেট ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করে। ড্যানের জন্ম হয়েছে ক্যালিফোর্নিয়ায়। কিন্তু বর্তমানে ওরা থাকে লস এ্যাঞ্জেলসে। জায়াগাটা আমেরিকায়। দেশটির পুরো নাম "ইউনাইটেড স্টেট অফ অ্যামেরিকা"। সংক্ষেপে ইউএসএ। ড্যানের বয়স যখন চার তখন ও ভর্তি হয় ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় এক স্কুলে। সেখান থেকেই ওর কম্পিউটারের হাতেখড়ি।
নয় বৎসর বয়সে ওরা চলে আসে লস এ্যাঞ্জেলসে। কারন বাবার বদলি হওয়া। মাও আবেদন করে লস এ্যাঞ্জেলসে পোস্টিং করে নেয়। এমনিতেই ওর জ্ঞান ভালো। নয় বৎসর হতে না হতেই ও অফিস এ্যাপ্লিকেশন,গ্রাফিক্স ডিজাইন,ভিজ্যুয়াল বেসিক,সি,সি++,সি#,সানজাভা,জাভা,প্যাসকেল ইত্যাদিতে পারদর্শী হয়ে ওঠে। বই পড়ে, শিক্ষক ও উপরের ক্লাসের ছাত্রদের সাহায্য নিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ও ক্রমে ক্রমে কম্পিউটারের অনেক প্রোগ্রামে আরও পারদর্শী হয়ে ওঠে। ক্যালিফোর্নিয়া স্কুলে প্রোগ্রামিঙে ও তিনবার একাডেমিক অ্যাওয়ার্ড জিতে নেয়।
ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকা কালীন সময়ে ওর মা-বাবা ওর তেমন আদর যত্ন নিতে পারেনি। তারপরও পরিবেশ ভাল থাকায় ওর পড়ালেখায় তেমন কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। অসত সঙ্গ বা অসত উপদেশও ওর কানে তখনও প্রবেশ করেনি। কিন্তু লস এ্যাঞ্জেলসে আসার পর থেকেই পরিবেশ উল্টে গেল। উজবুজ ও উড়নচন্ডী সব বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে ওর কোমল হৃদয় বিগড়ে গেল। ক্রমে ক্রমে ও শিখে উঠতে লাগল কিভাবে ওর পূর্ববর্তী শিক্ষাকে কাজে লাগিযে সফটওয়্যারকে হ্যাকিংয়ের কাজে লাগানো যায়। তিন চারটি ই-মেইল এ্যাকাউন্ট খুলে পাশাপাশি ও চালালো চ্যাটিং সাথে প্রাথমিকভাবে ক্রেডিট কার্ডের নাম্বার জোগাড় করা। বয়স, পরিচয়, বাসস্থান গোপন করে অথবা ভূল তথ্য দিয়ে চলতে থাকলো ই-ক্রাইম। একে একে ওর হাতে এল কয়েক হাজার ডলার।
এই মুহূর্তে ও একটি ওয়েবসাইট লঞ্চ করল যা কিনা পর্নো নির্ভর । চাইণ্ড, এ্যাডাল্ট সহ বিভিন্ন প্রকার পর্নো ছবি, ভিডিও দিয়ে ও সাজালো ওর সাইটকে। শুধুমাত্র ডো্মেইন কিনে ও নিজেই ডিজাইন করলো সাইটটি ঘরে বসে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে, বাজারের পাওয়া বিভিন্ন ডিভিডি থেকে ও পিকচার ও ভিডিও সংগ্রহ করলো। ধীরে ধীরে ওর ওয়েবসাইট বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠল। অনেক পর্নো নির্ভর প্রতিষ্ঠান ওর ওয়েবসাইটে নিজেদের অ্যাডের মাধ্যমে ওকে ডলার দিতে লাগল। ধীরে ধীরে ও যেন ফুলে ফেপে উঠতে লাগল। তবে এ সব কাজই চলতে লাগল ওর মা-বাবা এবং সকল প্রকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অগোচরে। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় ওয়েবসাইটের নেটওয়ার্কে আঘাত করে ও হ্যাক করলো।
তবে ও যা ই করুক না কেন সব কিছুই করে সাইবার ক্যাফেতে শুধুমাত্র নিজের ওয়েবসাইট ডেভেলোপমেন্ট ছাড়া। একেক সময় একেক ক্যাফেতে ও যায়। সফটওয়্যার এর মাধ্যমে ক্যাফের পিসির ব্রাউজিং ইনফরমেশনসড সকল হিস্টোরী ও ডিলিট করে দেয়। যার ফলে কোন ধরনের ইনেকোয়ারী ওকে ধরতে পারে না। তাছাড়া ওর বাসার পিসিতে ও ঘন ঘন ইন্টারনেট ব্রডব্যন্ড লাইন বদলানোর মাধ্যমে ও চালালো ক্রাকিং। একটি ক্রাকিং চালিয়ে ও নিজের ইন্টারনেট ক্লায়েন্ট আইপি বদলিয়ে ফেলে। এভাবে ও প্রায় কয়েক মিলিয়ন ডলারের মালিক হল।
কিন্তু মানুষ মাত্রই ভূল হয়। আর সেটাই তার ধ্বংসের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার। একদা ও একটি শীর্ষস্থানীয় ওয়েবসাইট হ্যাকিংয়ের জন্য সফটওয়্যার তৈরী করছিল প্রোগ্রামকোড লিখনের মাধ্যমে নিজের বাসার পিসিতে। ওয়েবসাইটটি ছিল একটি স্বনামধন্য হোটেলের। ওর উদ্দেশ্য ছিল হোটেলে এযাবত কালে যত লোক থেকেছে তাদের তথ্য যোগাড় করা। এসব তথ্য শহরের বড় মাফিয়া চক্রের কাছে মোটা অংকের ডলারে বিক্রি হবে। সেক্ষেত্রে অনেক শক্তিশালী সফটওয়্যার লাগবে। যাকে পরবর্তীতে ভাইরাস সফটওয়্যারে কনভার্ট করে ওই ওয়েবসাইটের নেটওয়ার্কে আক্রমন করতে হবে। তাহলেই ওর উদ্দেশ্য সফল হবে। তো ও প্রোগ্রাম লিখে তা কম্পাইল করছিল। রাত তখন গভীর। দু চোখের পাতা আর স্থির থাকতে চাইছিল না। শত হলেও বয়স কম। এই বয়সে এত পরিশ্রম কী আর ধাতে সয় ? এক সময় ও ঘুমিয়ে পড়ল।
কিন্তু বিধি বাম। প্রোগ্রামটি কম্পাইল হয়ে নিজ থেকেই রান হয়ে গেল এবং নিজে নিজেই ওয়েবসাইটটিকে হ্যাকড করল। এ সব ঘটনা ঘটল আরেকটি ভাইরাসের প্রভাবে। যা কিনা পূর্বে ড্যান তৈরী করেছিল। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এ ভাইরাসটি কম্পাইল কৃত প্রোগ্রামটিকে অটোরান করিয়ে অটোম্যাটিক ওয়েবসাইট হ্যাকড করে। তো ও সকালে উঠে দেখল এই অবস্থা। ততক্ষনে প্রকাশ হয়ে গেছে ওর কুকীর্তি। পুলিশ এস ধরে নিয়ে গেল।
এতদিন পর ওর মা-বাবা টের পেল তাদের ছেলের এ অধপতন। এবং এও টের পেল যে সন্তানকে শাসন এবং চোখে চোখে রাখার কত গুরুত্ব। তাই বাংলাদেশের সকল মা-বাবার প্রতি এই গল্পের লেখকের একটিই অনুরোধ থাকল আর তা হল আপনার সন্তানকে প্রযুক্তি বিদ্যায় শিক্ষিত করুন কারন এটাই হল ভবিষ্যতের পৃথিবীর একমাত্র সম্ভল। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন এই যে, আপনার সন্তানকে চোখে চোখে রাখুন। তার আচার আচরন লিপিবদ্ধ করুন। খারাপ বন্ধুদের চিহ্নিত করে তাদের সঙ্গ থেকে আপনার সন্তানকে বিরত রাখুন। সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা থেকে তাকে দূরে রাখুন। ন্যায়ের পথে চলতে এবং কাজ করতে শিক্ষা দিন। নব প্রযুক্তির সূচনায় নতুন প্রজন্মের বিকাশে সবাই এগিয়ে আসি এবং গড়ে তুলি এক সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ। ধন্যবাদ।
আমি যখন হ্যাকিং সম্পর্কে জানতে পারি তখন গল্পটি লিখা। সময়টা সম্ভবত ২০০৯ সালের প্রথম দিকে।
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত গল্প
বাজারে একদিন (স্বরচিত গল্প)
রাস্তার পাশেই ডাস্টবিন। বক্কর সাহেব পকেট থেকে রুমাল বের করে নাকে চাপা দিলেন। এ মুহূর্তে তার মাথায় একটি বরের পাগড়ি পরিয়ে দিলে যে কেউ তাকে বর ভেবে ভুল করতে পারে। যাক এমনটি হয়নি। কারন আশেপাশের অনেকেই নাকে রুমাল অর্থাত বক্কর সাহেবের পদাঙ্ক অনুসরন করেছে। কিছুদূর অগ্রসর হয়েই চেখে পড়ল চিরচেনা আরেকটি জিনিস। ম্যানহোল সেটি। যার ঢাকনা কবে নাগাদ নিখোজ হয়েছে তা কেউ স্বরন করতে পারে না। বক্কর সাহেব অতি সাবধানে সেটির পাশ কাটালেন। এইতো আর দশ কদম পরেই বাজার। বক্কর সাহেব তার প্যান্টের নিচের বাড়তি অংশটুকু গুটালেন। কারন বাজারে ঢুকলেই মত্স ধোয়ার পানিতে সৃষ্ট কাদায় তার মহা মূল্যবান না হলেও মহা উপকারী ও বিশ্বস্ত প্যান্টটির বারোটা বাজার পর তেরোটায় যেতে তেমন বিলম্ব হবে না। ইতিমধ্যেই তার নাকে বাজারের উৎকৃষ্ট (নাকি নিকৃষ্ট !) পচা মাছের গন্ধ পৌছাতে শুরু করেছে। বাংলাদেশে তৈরী পারফিউমগুলোর সাথে এ ব্যাপারটির বেশ অমিল খুজে পেয়েছেন বক্কর সাহেব। বাংলাদেশের পারফিউমগুলো শরীরে স্প্রে করার বিশ মিনিটের মধ্যে নিজেদের স্থায়িত্ব হারায়। তখন আশেপাশের লোকজন দূরে থাক নিজেই ঘ্রান নিতে ব্যর্থ হতে হয়। অথচ এই পচা মাছগুলোর গন্ধ প্রায় আধা মাইল দূর থেকেই নাসিকাগোচর হয়।
বক্কর সাহেব এখন এক মাছ ব্যবসায়ীর সামনে। লোকটি ডালায় এক ভাগ মাঝারী সাইজের পুটি মাছ নিয়ে বিক্রির প্রহর গুনছে। বক্কর সাহেব দাম জিজ্ঞেস করলে ওপাশ থেকে পঞ্চাশ টাকা প্রতিউত্তর পাওয়া গেল। হায়রে এ কয়টা অর্ধপচা মাছের দাম এত! বক্কর সাহেব ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে বেশ আতংকিত হয়ে পরলেন। ইদানিং ইলিশের প্রাচুর্যে দেশ নাকি ভাসছে। দেখা যাক ইলিশের দাম কেমন। বক্কর সাহেব পুটিগুলোর দাম বিশ টাকা বলে চলে এলেন ইলিশের দোকানের সামনে। এক বিঘা একটি ইলিশের দাম জানা গেল ষাট টাকা। লোকটি বত্রিশ দাত (অবশ্য কমও হতে পারে) বের করে মাছের দাম বলায় বক্কর সাহেবের মত নিপাট ভদ্রলোকের মেজাজ সপ্তমে উঠল। তিনি নিজেকে সংযত করে বললেন, এতটুকু মাছের দাম ষাট ? ব্যবসায়ী আবার তার দন্তকতিপয় প্রদর্শন করে বলল, জি স্যার, হইব না, ইলিশ বইলা কথা।
বক্কর সাহেবের বাজেট চল্লিশ টাকা। তিনি যদি ষাট টাকার মাছ কিনেন তাহলে অন্য সকল তরকারী গুলো কিনতে তার সমস্যা হয়ে যাবে। অগত্য বক্কর সাহেব পয়ত্রিশ টাকা দিয়ে একভাগ টেংরা কিনলেন। এবার তিনি তরকারী বাজার গেলেন আরেকপ্রস্থ সংগ্রামের জন্য। আলু ১৭ টাকা, কচুর লতি ২০ টাকা.........বক্কর সাহেবের পকেটে সম্বল মাত্র ৬৫ টাকা। প্রায় আধা ঘন্টা ঘোরাঘুরির পর তিনি এককেজি আলু ,বেগুন, দু টাকার ধনে পাতা, পাঁচ টাকার মরিচ ও দুটো মাঝারি সাইজের কাঁচা পেঁপে নিয়ে বাড়ি এলেন। এ রকম প্রায় প্রত্যেক বক্কর সাহেবের জন্য বাজার করাই নয় বরং জীবনের চলার প্রতি পদে পদেই সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়। কতদিন চলবে তাদের সংগ্রাম কে জানে। এটাই গ্রামবাংলার চিরন্তন গল্প।
গল্পটি বেশ কয়েক বছর আগে লিখা, তাই বর্তমান বাজারের সাথে মাছ বা তরকারির মূল্যে পার্থক্য থাকাটাই বাঞ্চনীয়।
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত গল্প
ছোট্ট একটা আর্জি (আত্মকথন)
পূর্নিমা রাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না। শুধুই বিমগ্ন নয়নে তাকিয়ে থাকতে থাকতে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে 'হে আকাশ আমাকে কি তোমার গোপন বিদ্যা শিখিয়ে দিবে কিভাবে এত উদার হতে হয়? আমি উদার হতে চাই, এ সংকীর্ণ মন নিয়ে জীবনযাপন করতে আমার খুব কষ্ট হয়। দাওনা শিখিয়ে।' আমার এ আর্জি আকাশ হয়ত শুনতে পায় না।
ভয় (প্রতিবেদন)
ভয়। দুটি ব্যাঞ্জন বর্নের সমন্বয়ে গঠিত একটি শব্দ। শব্দটি ছোট হলেও এর তাৎপর্য বা ব্যপকতা অনেক। এই শব্দটির ক্ষমতা এতই বেশি যে এই ব্যাপারটি সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। ভয় সম্পর্কে কিছু বলার পূর্বে এর মোটামুটি একটি সংজ্ঞা দেওয়া প্রয়োজন। অনেক চিন্তা করার পর যে সংজ্ঞাটি আমার মনোপুত হয়েছে তা হল "যার কারনে হৃদপিন্ডের রক্তচলাচল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়,অনুশোচনা করতে ইচ্ছে করে,মস্তিষ্ক-চোখ-মুখ তপ্ত হয়ে ওঠে,একপ্রকার ঠান্ডা শিহরন মস্তিষ্ক ও শিরদাড়া বেয়ে নীচে নেমে যায়,হাত-পা অস্বাভাবিকভাবে কাপতেঁ থাকে,দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়,চলাচল করার বা নড়াচড়া করার শক্তি হারিয়ে যায় এছাড়াও সমস্ত শরীরে ঘাম এসে যায় ইত্যাদি কারনকে সামগ্রিকভাবে ভয় বলে।" উপরোক্ত কারনগুলোর কোন না কোনটা প্রায় প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে। ভয়ের অনেক প্রকারভেদ রয়েছে।
প্রকারভেদ :
১। সৃষ্টিকর্তার ভয়,
২। মৃত্যুর ভয়,
৩। সম্পদ হারানোর ভয়,
৪। স্বাস্থ্য হারানোর ভয়,
৫। সম্মান হারানোর ভয়,
৬। অলৌকিক সত্ত্বার ভয়,
৭। চাকরি হারানোর ভয়,
৮। অঙ্গহানীর ভয়,
৯। আত্মবিশ্বাসের ভয়,
১০। শিক্ষার ভয় বা পরিক্ষার ভয় ইত্যাদি।
আলোচনা:
আমি আজকে যে ভয়কে নিয়ে আলোচনা করব সেটি হচ্ছে অলৌকিক সত্ত্বার ভয়। অলৌকিক সত্ত্বার ভয় বলতে আমি বুঝিয়েছি কোন অতৃপ্ত আত্মার ভয়,ভূতের ভয়,অন্ধকারের আলো আধারীর ভয়,অজানা ভয় ইত্যাদি। আমি উপরের যতগুলো ভয়ের কথা বলেছি আসলে প্রকৃতপক্ষে তার কোনটাই সরল স্বাভাবিক ভয় নয়। প্রত্যেকটাই অস্বাভাবিক ভয়। মানুষের মনের অজানা কোন কুঠুরিতে এই অস্বাভাবিকতার জন্ম। সকল ভয়ই মানুষের মনের অবদান। প্রত্যেক ভয়ই মানুষের অবচেতন মন থেকে উত্পত্তি লাভ করে থাকে। সে ভয়ের সুনির্দিষ্ট কোন কারন নেই। যা মানুষের অস্বাভাবিক চিন্তার ফসল।
মানুষের মাঝে ভয় যেভাবে জন্ম নেয়:
মানুষ সবকিছুই তার পরিবার থেকে শিখে। পরিবারের পাট চুকিয়ে সে প্রকৃতি ও আশপাশের পরিবেশ থেকে শিখতে থাকে। প্রায় প্রত্যেকটি জিনিসই সে পরিবেশ থেকে শিখে। তবে তার মন পরিপূর্ণতা লাভ করলে সে নিজের কাছ থেকেই অনেক কিছু শিখতে থাকে। বহুকাল পূর্বে থেকে যা চলে এসেছে তা মানুষ সাধারনত সমাজ বা পরিবেশ থেকেই শিক্ষা লাভ করে। ভয়ও ঠিক তেমনি। এ জিনিসটিও মানুষ আশপাশের মানুষের আচরন,কথাবার্তা বা পরিবেশ থেকে শিক্ষা লাভ করে। ভয় পাওয়া অনেকটা স্কুলে শিক্ষা লাভের মতই। কেউ যদি ছোটকাল থেকেই ভয়ের সাথে পরিচিত না হয় তাহলে আশা করা যায় বড় হলে তার মধ্যে ভয় নামক জিনিসটি ঠিক মত কাজ করবে না। অর্থাত ভয় মানুষ পরিবেশ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে থাকে।
মানুষ কেন ভয় পায়?
মানুষ কেন ভয় পায়, এই প্রশ্নটির উত্তর বেশ কঠিন । একথা সত্য যে প্রত্যেক মানুষই তার রিপু দ্বারা প্রভাবিত। অন্ধকার দিয়ে হাটছি হঠাত যদি কোথাও একটি অস্বাভাবিক শব্দ হয় তাহলে অবশ্যই আমাকে থমকে দাড়াতে হবে। হয়তো তখন দেহে রক্ত চলাচল বৃদ্ধি পাবে। হ্যা, প্রশ্ন ছিল মানুষ ভয় পায় কেন? এ প্রশ্নটির উত্তর জানতে আমাকে কথা বলতে হয়েছিল এমন কিছু মানুষের সাথে যারা প্রকৃতপক্ষেই এ সব অলৌকিক অস্বাভাবিক সত্ত্বাকে ভয় পায়। তাদের সাথে কথা বলে আমি যে কয়টি তথ্য উদ্ধার করতে পেরেছি সেগুলো হল:
১। যখনই আমি একা হয়ে যাই তখনই মনে হয় কেউ আমাকে তাড়া করছে। কোন কোন সময় মনে হয় সে আমার আশপাশেই ঘুরঘুর করছে। যেকোন সময় আমার উপর ঝাপিয়ে পড়ে ঘাড়টা মটকে দিতে পারে।
২। একা হাটলেই মনে হয় কেউ আমার পিছু নিয়েছে। বাতাসের সাথে সাথে সেও আমাকে ঘীরে আছে। যেকোন সময় সে তার অস্তিত্ব প্রকাশ করতে পারে।
৩। একা থাকা মানেই ভয়। আর একা হলেই আমার ভয় লাগে। সে যে কারনেই হোক না কেন। হয়ত এটা আমার অভ্যাসে পরিনত হয়েছে।
৪। একা খাটে শুলেই মনে হয় রাতে অতিপ্রাকৃত কোন কিছু আমার সাথে শোবে। সে আমাকে মেরে ফেলবে। মাঝে মাঝে আমি তার অস্তিত্ব অনুভব করি। তার ছবি আমার চোখের সামেনে ভেসে উঠে। সে তো একা নয়। তার সাথে আছে আরও অনেক সে। সে মানে ভূত।
ভয় পাওয়ার কতগুলো প্রকৃত উদাহরন:
১। জ্যোৎস্না রাত। রিকশায় বসে আছি একা (কোন এক কারনে,রিকশা ওয়ালা কিছু সময়ের জন্য অনুপস্থিত)। মনে হল আশপাশের সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত আনুমানিক সাড়ে দশটা। গ্রামে এমনিতেই লোকজন তারাতারি ঘুমিয়ে পড়ে। আমি যেখানে রিকশায় বসে আছি তার পাশে বাঁশঝাড়ের নীচেই দুটি 'কবর'। 'কবর' থেকে কিছুদূর গেলেই বেশ প্রশস্থ খাল। কবরের ঠিক বিপরীত দিকে কিছুদূরে কৃত্রিম বন-জঙ্গল। তার উপরে পূর্ণিমা চাঁদ উঁকি দিয়ে রয়েছে। উত্তর দক্ষিন থেকে হাওয়া বইছিল ঝিরঝির করে। হাওয়ার তালে বাঁশের পাতা নড়ছিল আর খসখস শব্দ হচ্ছিল। যার ফলে চাঁদের আলোয় এক আলো আধারীর খেলা চলছিল, মনে হচ্ছিল কবর থেকে উঠে আসা প্রেতাত্মাগুলো নাচছে। নদীর দিকে তাকাতেই মনে হল এই বুঝি ভেসে উঠল কোন অজানা কিছু। কিন্তু সেই অজানা কিছুটি কী?
২। নিজ এলাকা থেকে কিছু দূরে ওয়াজ মাহফিল হচ্ছে। ওয়াজ মাহফিলে হরেক রকমের খাবার আসত। ছোট ছিলাম বলে এগুলোর প্রতিই ঝোক ছিল বেশি। তো ওয়াজ শুনছি আর খাবার খাচ্ছি। রাত তখন এগারোটা। হঠাত খেয়াল হল আমার বন্ধুদেরকে আশপাশে দেখছি না। খোঁজকরে বুঝলাম আমাকে রেখেই বাছাধনরা বাড়িতে চলে গেছে। আমাবস্যা রাত। নিজ গ্রামের কাউকে না পেয়ে একাই রওনা দিলাম। হাটছি একা। মাঝে মাঝে রাস্তায় হয়তো দু একজনের সাথে দেখা হচ্ছে। হাটছি তালগাছের নীচ দিয়ে। মনে হল এই বুঝি তালগাছের আগা থেকে আমার কাধে ঝাপিয়ে পড়ল সে। যাচ্ছি নদীর পাশ দিয়ে। যাচ্ছি বাঁশঝারের পাশ দিয়ে। মাথার উপর বাঁশের পাতা খসখস করছে। মনে হয় যেন নি:শ্বাস ফেলছে কোন অতৃপ্ত কেউ। অথবা কখনও মনে হল আমাকে কেউ পেছন থেকে তাড়া করছে। যাক বাড়িতে এস পৌঁছলাম শেষ পর্যন্ত একদম একাই।
আপনি নিজেও ইচ্ছে করলেই ভয় পেতে পারেন:
১। হরর ফিল্ম দেখছেন। ফিল্ম দেখা শেষ হলে ঘুমোতে যাবেন্ ঘরের বাতি নিভান। একটি জানালা খুলে দিন। মনে করুন হরর ফিল্মে যা দেখেছেন তাই ঘটতে যাচ্ছে আপনার সাথে। চতুর্দিক থেকে ওরা আসছে আপনাকে তাড়া করতে। একটু ভাবুন তো তখন আপনার অবস্থাটা কী হবে?
২। ছোট বেলায় দাদীর কাছে একটি ভূতের গল্প শুনেছেন। ঠিক এমন একটি গল্পই মনে করার চেষ্ঠা করুন। দাদী ভূতের চেহারা আকৃতির যে বর্ণনা দিয়েছেন তা মনে করার চেষ্ঠা করুন। রাস্তায় বা ঘরের মধ্যে অন্ধকারে সেই ভূতের ছবিটি ভিজুয়ালাইজ করুন। আশ্চর্য হয়ে যাবেন আপনি যখন দেখবেন আপনার ঠিক চোখেন সামনেই দাড়িয়ে আছে আপনার কল্পিত সেই ভূতটি।
৩। রুমে আপনি একা। রুমটি অন্ধকার। বাইরেও বেশ অন্ধকার। সম্ভবত আমাবস্যা রাত। ভাবুন আপনার রুমের জানালার একটি কপাট ফাকঁ হয়ে আছে। তার মধ্য দিয়ে একজোড়া লাল রাগত চোখ আপনাকে অনেকক্ষন যাবত লক্ষ করছে। যেকোন সময় জানালার ফাঁক গলে সে আপনার কাছে চলে আসতে পারে। তখন আপনার কী অবস্থাটা হবে চিন্তা করেছেন?
৪। আর হ্যা খুব বেশী সাহসী হলে কবরস্থানের মধ্যখানে গিয়ে বসে থাকুন একদম একলা। ভয় কাকে বলে হয়ত তখন টের পাবেন।
ভয়ের সাথে বন্ধুত্ব করা:
আমাদের প্রত্যেকেরই কম বেশী বন্ধু আছে। আমরা বন্ধুদেরকে সাধারনত ভয় পাই না। তাই আমাদের ভয়কে বন্ধু ভাবতে হবে। পার্থিব জগতে সবার সাথেই ভয় আছে। ভয় থাকবেই। ভয় তো আমার বন্ধু। সে আমাকে সঙ্গ দেয়। আমি যখন একা থাকি তখন তার থেকে ভালো বন্ধু আর কোথায় পাবো? ভয় আমারে অনেক বন্ধুদের মাঝে একজন।
ভয়কে খেলা ভাবা:
ফুটবল,ক্রিকেট,হকি কত ধরনের খেলাইতো আমরা খেলি। ভয়ও তেমনি একটি খেলা। এ খেলাটির নাম ভয়-ভয় খেলা। এ হচ্ছে খেলাচ্ছলে ভয় পাওয়া। সবসময় ভাবুন ভয়কে নিয়ে আমি খেলা করি। আর এ খেলায় আমার জয় অবশ্যাম্ভাবী।
জগতে ভূত বলে কিছু নেই:
জগতে সত্যিই ভূত বলে কিছু নেই। মানুষ ভয় পায় তার মনের জন্য। তার উদ্ভট কল্পনার জন্য সে ভয় পায়। ভূত পেত্নী এ সব তার নিজের বানানো চরিত্র। প্রকৃতিতে বা বাস্তবে এদের কোন অস্তিত্ব নেই। মানুষ যখন কল্পনায় এসব নিয়ে ভাবে তখন সে বাস্তবে এ চরিত্রগুলো ভিজুয়ালাইজ করে যার ফলে এসব চবিত্র তার সামনে বাস্তব রূপে ধরা দেয়।
অন্ধকারই ভালো:
অন্ধকারই ভালো। আলোর চেয়ে অন্ধকারই ভালো। ভয় যারা পান তাদেরকে এ কথাটিই মনে প্রানে বিশ্বাস করতে হবে। অন্ধকারেই আমি স্বস্তি বোধ করি। নিজের মত করে নিজেকে ভাবার সুযোগ পাই। নিজের মনকে নিয়ন্ত্রনের সুযোগ মেলে অন্ধকারেই।
ভয় নেই !
কি বুঝছেন? এখন আর আপনি ভয় পাচ্ছেন না। ঠিক তাই? ভয়কে বন্ধু ভাবা,অন্ধকার ভালো লাগা,ভয়-ভয় খেলা এগুলো প্রত্যহ অনুশীলন করলে ভয়ই বরং আপনাকে ভয় পাবে। চেষ্ঠা করেই দেখন না।
*** উপরোক্ত প্রতিবেদন কোন বৃহৎ গবেষনার ফসল নয়। যার ফলে এত ভূল থাকাই স্বাভাবিক।
“সানারপাড় কম্পিউটার টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট” এর প্রসপেক্টাসের জন্য বাণী
আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যান্ত আনন্দের সাথে লক্ষ্য করেছি যে, উল্লেখযোগ্য হারে বাংলাদেশর অর্থনৈতিক উন্নয়নে আউটসোর্সিং শিল্প ব্যাপক প্রভাব রাখছে। তবে পরিতাপের বিষয় যেখানে ওডেস্ক নামক বিশ্বের অন্যতম বিশাল আউটসোর্সিং মার্কেটপ্লেসে ফিলিপাইনের মত দেশ প্রথম অবস্থানে থাকে সেখানে পযার্প্ত ট্রেনিং সহায়তা ও উদ্যোগ-সচেতনতার অভাবে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। তবে বিশ্বের আরেক বিশাল আউটসোর্সিং মার্কেটপ্লেস ফ্রিল্যান্সার ডট কম আয়োজিত “লোগো এক্সপোজার” প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশের শাওন বিজয়ী হওয়া ও “এসইও” প্রতিযোগীতায় বাংলাদেশের ডেভসটিমের প্রথম হওয়া প্রমান করে আমার এগিয়ে যাচ্ছি। আউটসোর্সিং একটি অত্যান্ত সম্ভাবনাময় আয়ের ক্ষেত্র। ২০১০ সালে এই খাতে আয় হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ ডলার এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে এই আয় বেড়ে দাড়িয়েছে ১০ কোটি ডলারে।
অন্যদিকে অটোক্যাড হচ্ছে এমন একটি প্রোগ্রাম যার মাধ্যমে বিমান, জাহাজ, দালান, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ, নকশা, প্যাটার্নসহ প্রায় সবকিছুরই ডিজাইন করা যায়। প্রাথমিক পযার্য়ে মাত্র কয়েকটি কমান্ড আর টুলস দিয়ে কাজ করা গেলেও দ্বিমাত্রিক, ত্রিমাত্রিক, মোবাইল অ্যাপ, শতাধিক কমান্ড ও টুলস নিয়ে অটোক্যাডকে আজ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি ডিজাইন সফটওয়্যার বলা যায়। গার্মেন্টস শিল্প থেকে আরম্ভ করে টেক্সটাইল, জাহাজ শিল্প, বিমান শিল্প, ইন্টেরিয়র ডিজাইন ইত্যাদিতে অটোক্যাড প্রোগ্রাম ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অটোক্যাডে প্রশিক্ষনপ্রাপ্তরা কোন প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রী ছাড়াই বড় বড় প্রতিষ্ঠানে অটোক্যাড অপারেটর হিসেবে কাজ করতে পারে। দেশ ও দেশের বাহিরে অটোক্যাডে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
আমি মনে করি, আইসিটিকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করা, বেকার সমস্যা দূরীকরণ এবং দারিদ্র বিমোচনে অবদান রাখা যাবে। আইসিটির ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ উল্লেখযোগ্যহারে অর্জন করা সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। “সানারপাড় কম্পিউটার টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট” যে গুরুদায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করে যাচ্ছে আমি সেটার উত্তরোত্তর সফলতা কামনা করি।
লেখক :
মেহেদী হাসান
ডিপ্লোমা ইন কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড আইসিটি
এসইও এন্ড বিটুবি কনসালটেন্ট
প্রধান নিবার্হী
স্টারিয়ণ লিমিটেড
Tag :
আমার লেখা,
চিত্তাকর্ষক সংবাদ
অজানা গন্তব্য
আমি এক পথভোলা মানুষ
ঠিকানাবিহীন গন্তব্যে চলছি একা,
বিশ্রামহীন আমি
আমি ক্লান্ত
আমার কোন পরিচয় নেই
নেই কোন আশা,
আমি নিজেই জানি না
আমি কে?
দিন কাটাই আমি
প্রানী এবং বৃক্ষের সাথে কথা বলে
পেটের দায়ে কাজ করি।
রাত কাটাই আমি
খোলা আকাশের নীচে
কথা বলি আকাশের
চাঁদটির সাথে
তারকারাজির সাথে।
তাদের প্রশ্ন করি আমি
তোমরা কি কেউ জানো
আমার পরিচয়-
আমি কে?
কেউ বলতে পারে না
আমার ঠিকানা।
মনে মনে ভাবি
সত্যিই আমি দুর্ভাগা।
আবার পা চালাই
অজানা গন্তব্যের দিকে
চলতে চলতে পা ব্যাথা হয়ে
যায় আমার।
আমি ক্লান্ত, আমি বিশ্রামহীন।
হঠাৎ আমার সামনে পড়ে
একটা ভাঙ্গা সাঁকো
আমি ভাবি পৃথিবীটাও
ভাঙ্গা সাঁকোর মত।
পৃথিবী তার সকল জীবসহ
আস্তে আস্তে
ভেঙ্গে পড়ছে অতল গর্ভে।
কিন্তু এ ভাঙ্গা বিধ্বস্ত
পৃথিবীটাকে মেরামত করতে হবে
উদ্ধার করতে হবে এর
সকল জীবদের।
কিন্তু কে করবে তাদের উদ্ধার?
কেউ কি নেই এ পৃথিবীর
মেরামতকারী?
ভাবতে ভাবতে কল্পনা থেকে
বাস্তবে ফিরে আসি আমি।
সামনে ভাঙ্গা সাঁকো
এ ভাঙ্গা সাঁকোটি
মেরামত করতে হবে।
কিন্তু আমি কে মেরামত করার?
আমি তো নিজেই আমার
পরিচয় জানি না।
জানি না আমার গন্তব্য সম্পর্কে
কেউ কি বলবে-
আমি কে?
কি আমার পরিচয়?
হে পৃথিবীর মানুষ
তোমাদের মধ্যে কেউ কি নেই
যে আমার পরিচয়
বলতে পারে?
স্থানীয় এক চাচা বলেছিলেন
যুদ্ধে আমার মা-বাবা
মারা গেছেন।
কিন্তু তাদের পরিচয় কি?
চাচা বলতে পারেন না।
বাবা-মা নাকি
শহর থেকে এসেছিলেন।
বাবা-মা না হয় মারা গেছেন
কিন্তু তোমরা কেউ কি
আমার পরিচয়
বলতে পারবে না?
বুঝেছি কেউ বলতে পারবে না
আমার পরিচয়।
কারন তোমরাইতো জানো না
তোমাদের আসল পরিচয়!
এ পৃথিবীতে তোমরা কি জন্য
এসেছ,
কি তোমাদের কর্তব্য তা-ও
ভুলে গেছ তোমরা।
কিন্তু তোমাদের তো
ভুলে যাবার কথা নয়।
কর্তব্য সম্পর্কে এ হেয়ালীপনা
মোটেই ভালো নয়।
যদি নিজেদের পরিচয় নিজেরাই
জানো না
তাহলে দাড়িয়ে আছ কেন?
চলে এস আমার সাথে
সকলে পা চালাই
অজানা গন্তব্যের দিকে।
ঠিকানাবিহীন গন্তব্যে চলছি একা,
বিশ্রামহীন আমি
আমি ক্লান্ত
আমার কোন পরিচয় নেই
নেই কোন আশা,
আমি নিজেই জানি না
আমি কে?
দিন কাটাই আমি
প্রানী এবং বৃক্ষের সাথে কথা বলে
পেটের দায়ে কাজ করি।
রাত কাটাই আমি
খোলা আকাশের নীচে
কথা বলি আকাশের
চাঁদটির সাথে
তারকারাজির সাথে।
তাদের প্রশ্ন করি আমি
তোমরা কি কেউ জানো
আমার পরিচয়-
আমি কে?
কেউ বলতে পারে না
আমার ঠিকানা।
মনে মনে ভাবি
সত্যিই আমি দুর্ভাগা।
আবার পা চালাই
অজানা গন্তব্যের দিকে
চলতে চলতে পা ব্যাথা হয়ে
যায় আমার।
আমি ক্লান্ত, আমি বিশ্রামহীন।
হঠাৎ আমার সামনে পড়ে
একটা ভাঙ্গা সাঁকো
আমি ভাবি পৃথিবীটাও
ভাঙ্গা সাঁকোর মত।
পৃথিবী তার সকল জীবসহ
আস্তে আস্তে
ভেঙ্গে পড়ছে অতল গর্ভে।
কিন্তু এ ভাঙ্গা বিধ্বস্ত
পৃথিবীটাকে মেরামত করতে হবে
উদ্ধার করতে হবে এর
সকল জীবদের।
কিন্তু কে করবে তাদের উদ্ধার?
কেউ কি নেই এ পৃথিবীর
মেরামতকারী?
ভাবতে ভাবতে কল্পনা থেকে
বাস্তবে ফিরে আসি আমি।
সামনে ভাঙ্গা সাঁকো
এ ভাঙ্গা সাঁকোটি
মেরামত করতে হবে।
কিন্তু আমি কে মেরামত করার?
আমি তো নিজেই আমার
পরিচয় জানি না।
জানি না আমার গন্তব্য সম্পর্কে
কেউ কি বলবে-
আমি কে?
কি আমার পরিচয়?
হে পৃথিবীর মানুষ
তোমাদের মধ্যে কেউ কি নেই
যে আমার পরিচয়
বলতে পারে?
স্থানীয় এক চাচা বলেছিলেন
যুদ্ধে আমার মা-বাবা
মারা গেছেন।
কিন্তু তাদের পরিচয় কি?
চাচা বলতে পারেন না।
বাবা-মা নাকি
শহর থেকে এসেছিলেন।
বাবা-মা না হয় মারা গেছেন
কিন্তু তোমরা কেউ কি
আমার পরিচয়
বলতে পারবে না?
বুঝেছি কেউ বলতে পারবে না
আমার পরিচয়।
কারন তোমরাইতো জানো না
তোমাদের আসল পরিচয়!
এ পৃথিবীতে তোমরা কি জন্য
এসেছ,
কি তোমাদের কর্তব্য তা-ও
ভুলে গেছ তোমরা।
কিন্তু তোমাদের তো
ভুলে যাবার কথা নয়।
কর্তব্য সম্পর্কে এ হেয়ালীপনা
মোটেই ভালো নয়।
যদি নিজেদের পরিচয় নিজেরাই
জানো না
তাহলে দাড়িয়ে আছ কেন?
চলে এস আমার সাথে
সকলে পা চালাই
অজানা গন্তব্যের দিকে।
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত কবিতা
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত কবিতা
জল ফরিং
জল ফরিং
- মেহেদী হাসান
- মেহেদী হাসান
দূর নীলিমায় তাকিয়ে যখন ছিলে
চুলের মাঝে আড়াল করে মিষ্টি হেসে দিলে,
মনে কি হয়েছিল-চাঁদ যে তোমার মিতা
কল্পনাতে রঙ ছড়িয়ে লিখলাম এ কবিতা।
কোমল ঘাসের ডগায় ঝুলে
শিশিরের জল-তরঙ্গ,
তোমায় দেখে মুনি-ঋষিরও
হবে ধ্যান ভঙ্গ।
তোমায় দেখে আকাশের চাঁদটিও
পেয়ে গেল যে লজ্জা,
তোমায় দেখে কঠিন পর্বতও
সাগর তীরে নিল শয্যা।
কবিতার প্রতিটি ছন্দের মতই
তুমি যে নির্মল-নির্ঝর,
পৃথিবীও তোমায় আপন করে
সকলকে করে দিবে পর।
সুহাসিনী তুমি, প্রিয়ংবদা তুমি
তুমিতো অনন্যা,
তোমার জন্য আকাশ থেকে
ঝড়বে তারার বন্যা।
শুভ্রকাশেঁর শুভ্রতায় ভরা
তোমার কোমল মন,
সবাই চাইবে থাকতে তোমার
পাশে একটুক্ষণ।
লিওনার্দের মোনালিসাও
তোমার কাছে আসবে,
জানতে চাইবে কী করে সে
তোমার মত-চিরসবুজ হাসি হাসবে।
সবাই তোমায় বন্দি করতে
চাইবে যত,
সবার চোখকে ফাকিঁ দিয়ে উড়বে তুমি
মুক্ত জল ফরিংয়ের মত।
চুলের মাঝে আড়াল করে মিষ্টি হেসে দিলে,
মনে কি হয়েছিল-চাঁদ যে তোমার মিতা
কল্পনাতে রঙ ছড়িয়ে লিখলাম এ কবিতা।
কোমল ঘাসের ডগায় ঝুলে
শিশিরের জল-তরঙ্গ,
তোমায় দেখে মুনি-ঋষিরও
হবে ধ্যান ভঙ্গ।
তোমায় দেখে আকাশের চাঁদটিও
পেয়ে গেল যে লজ্জা,
তোমায় দেখে কঠিন পর্বতও
সাগর তীরে নিল শয্যা।
কবিতার প্রতিটি ছন্দের মতই
তুমি যে নির্মল-নির্ঝর,
পৃথিবীও তোমায় আপন করে
সকলকে করে দিবে পর।
সুহাসিনী তুমি, প্রিয়ংবদা তুমি
তুমিতো অনন্যা,
তোমার জন্য আকাশ থেকে
ঝড়বে তারার বন্যা।
শুভ্রকাশেঁর শুভ্রতায় ভরা
তোমার কোমল মন,
সবাই চাইবে থাকতে তোমার
পাশে একটুক্ষণ।
লিওনার্দের মোনালিসাও
তোমার কাছে আসবে,
জানতে চাইবে কী করে সে
তোমার মত-চিরসবুজ হাসি হাসবে।
সবাই তোমায় বন্দি করতে
চাইবে যত,
সবার চোখকে ফাকিঁ দিয়ে উড়বে তুমি
মুক্ত জল ফরিংয়ের মত।
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত কবিতা
ভবিষ্যৎবানী
আজ সকাল থেকেই আবদুল্লাহকে কেমন যেন মনমরা মনে হল। ব্যপারটা কি জিজ্ঞেস করেও জানা গেল না। নিজের মনে বিড়বিড় করে কি যেন বলছে আর বারবার ভ্রু কোচকাচ্ছে। তিনমাসের জন্য ও মিরপুরের ৭ নম্বরে মেস ভাড়া করেছে। ওর পাশের রুমেই আমি থাকি। আমার নাম কামরুল। কামরুল হাসান, পেশা-ছাত্র। মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে পড়ছি অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ইংলিশে। আবদুল্লাহর সাথে পরিচয় এই মেসেই। আমি এই মেসে আছি গত ছয়মাস যাবত আর ও এসেছে মাত্র দশ দিন। ঢাকায় ওদের নিজেদের বাড়ি আছে, তারপরেও এই বস্তিটাইপ মেসে এসেছে থাকার জন্য, এর কারন জিজ্ঞেস করতেই সহাস্যে উত্তর এল, গবেষণা করতে। আমি মনে করেছিলাম ও যেহেতু লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়ছে তাহলে হয়ত এই বিষয়েই কোন গবেষনা হবে। তারপরেও জিজ্ঞেস করলাম।
কি গবেষণা? -উত্তর এল পরাবাস্তব জগৎ নিয়ে গবেষণা। বাড়িতে এসব করতে নিষেধ করায় মেসে এসে উঠেছি।
ওর রুমে আজব আজব জিনিসে ভরা। প্রানীর হাড় (অজানা), বড় শামুকের খোল, রঙ-বেরঙের মোমবাতি, নানান ধরনের পাথর, দাবার বোর্ডের মত মস্ত বড় বোর্ড, বিভিন্ন ধরনের পাখির পালক, ব্যারোমিটার, থার্মোমিটার, নিক্তি, বিশেষভাবে সংরক্ষিত জীবন্ত পিপড়ে, বোতল ভর্তি জোঁকসহ আরো অনেক নাম না জানা বস্তু। এসব দেখে গবেষনার ধরন ঠিক বোঝা গেল না।
আবদুল্লাহ্ অধিকাংশ সময়ই রুমের ভেতর থাকে। বের হয় খুব কম। প্রয়োজন ছাড়া একটি কথাও বলে না। আজ হঠাৎ করেই মনমরা লাগছে ওকে। সারাদিন এই অবস্থা চলল। অবশ্য রুম থেকে যতবার বের হয়েছে ততবারই মনমরাই দেখেছি। রাত ঠিক সাড়ে বারোটার পর ও অপ্রত্যাশিতভাবে আমার রুমে এল। এর আগে কখনই আমার রুমে ও আসেনি।
এতরাতে এসে ডির্স্টাব করলাম না তো? আবদুল্লাহর প্রশ্ন, চেহারা থেকে মনমরা ভাব উধাও। তার স্থলে স্থান নিয়ে মুচকি হাসি।
আরে না,না। এমনিতেই আমার ঘুমাতে ঘুমাতে দেড়টা-দুটো বাজে। তা কি খবর? আমি বললাম।
ভালো খবর, আজ রাত দুটো নাগাদ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল বিশেষ কের সুন্দরবন নিশ্চিন্হ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বিজ্ঞানীদের এরকমই ভাষ্য ছিল। সেটি আর ঘটবে না। বঙ্গোপসাগরে যে ঘূর্নিঝড়টির আবির্ভার ঘটেছে সেটি হঠাৎ করে মহাসাগরের মাঝে এসে রাত একটার দিকে থেমে যাবে। খবরটি পেলাম এই মাত্র। তাই তোমাকে জানাতে এলাম।
ও আচ্ছা, তোমার সারাদিনের মনমরা অবস্থার এই তাহলে কারন? তা খবরে বলেছে নাকি?
আরে নাহ, খবরের লোকজন জানবে কোথা থেকে। এখনও তো একটা-ই বাজে নি। ঘূর্নিঝড় থামবে একটা-য়। তারপরেতো তারা খবর পাবে।
তাহলে তুমি ভবিষ্যৎবানী করলে কিভাবে? -আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
অলৌকিকতায় বিশ্বাস কর তুমি? -আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসা।
আমি উত্তর দেয়ার আগেই ও বলল, অলৌকিকতা, প্রকৃতির সন্তানদের আচরনসহ আরো কিছু একসাথে অবজারভেশন করে এই সিদ্বান্তে পৌছতে হয়েছে আমাকে। এই বলে ও নিজের রুমে চলে গেল।
পাঠক রাত একটায় কিন্তু সত্যিই ঘূর্নিঝড়টি থেমে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা ঘূর্নিঝড়ের এমন আচরনে বেশ অবাক হয়েছেন। উপকূলবাসীদের উল্লাসের দিনটি মনে রাখার মত ছিল।
কি গবেষণা? -উত্তর এল পরাবাস্তব জগৎ নিয়ে গবেষণা। বাড়িতে এসব করতে নিষেধ করায় মেসে এসে উঠেছি।
ওর রুমে আজব আজব জিনিসে ভরা। প্রানীর হাড় (অজানা), বড় শামুকের খোল, রঙ-বেরঙের মোমবাতি, নানান ধরনের পাথর, দাবার বোর্ডের মত মস্ত বড় বোর্ড, বিভিন্ন ধরনের পাখির পালক, ব্যারোমিটার, থার্মোমিটার, নিক্তি, বিশেষভাবে সংরক্ষিত জীবন্ত পিপড়ে, বোতল ভর্তি জোঁকসহ আরো অনেক নাম না জানা বস্তু। এসব দেখে গবেষনার ধরন ঠিক বোঝা গেল না।
আবদুল্লাহ্ অধিকাংশ সময়ই রুমের ভেতর থাকে। বের হয় খুব কম। প্রয়োজন ছাড়া একটি কথাও বলে না। আজ হঠাৎ করেই মনমরা লাগছে ওকে। সারাদিন এই অবস্থা চলল। অবশ্য রুম থেকে যতবার বের হয়েছে ততবারই মনমরাই দেখেছি। রাত ঠিক সাড়ে বারোটার পর ও অপ্রত্যাশিতভাবে আমার রুমে এল। এর আগে কখনই আমার রুমে ও আসেনি।
এতরাতে এসে ডির্স্টাব করলাম না তো? আবদুল্লাহর প্রশ্ন, চেহারা থেকে মনমরা ভাব উধাও। তার স্থলে স্থান নিয়ে মুচকি হাসি।
আরে না,না। এমনিতেই আমার ঘুমাতে ঘুমাতে দেড়টা-দুটো বাজে। তা কি খবর? আমি বললাম।
ভালো খবর, আজ রাত দুটো নাগাদ বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চল বিশেষ কের সুন্দরবন নিশ্চিন্হ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। বিজ্ঞানীদের এরকমই ভাষ্য ছিল। সেটি আর ঘটবে না। বঙ্গোপসাগরে যে ঘূর্নিঝড়টির আবির্ভার ঘটেছে সেটি হঠাৎ করে মহাসাগরের মাঝে এসে রাত একটার দিকে থেমে যাবে। খবরটি পেলাম এই মাত্র। তাই তোমাকে জানাতে এলাম।
ও আচ্ছা, তোমার সারাদিনের মনমরা অবস্থার এই তাহলে কারন? তা খবরে বলেছে নাকি?
আরে নাহ, খবরের লোকজন জানবে কোথা থেকে। এখনও তো একটা-ই বাজে নি। ঘূর্নিঝড় থামবে একটা-য়। তারপরেতো তারা খবর পাবে।
তাহলে তুমি ভবিষ্যৎবানী করলে কিভাবে? -আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
অলৌকিকতায় বিশ্বাস কর তুমি? -আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসা।
আমি উত্তর দেয়ার আগেই ও বলল, অলৌকিকতা, প্রকৃতির সন্তানদের আচরনসহ আরো কিছু একসাথে অবজারভেশন করে এই সিদ্বান্তে পৌছতে হয়েছে আমাকে। এই বলে ও নিজের রুমে চলে গেল।
পাঠক রাত একটায় কিন্তু সত্যিই ঘূর্নিঝড়টি থেমে গিয়েছিল। বিজ্ঞানীরা ঘূর্নিঝড়ের এমন আচরনে বেশ অবাক হয়েছেন। উপকূলবাসীদের উল্লাসের দিনটি মনে রাখার মত ছিল।
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত গল্প
সায়েন্স ফিকশন : প্যারালেল ওয়ার্ল্ড
ওরে বাপরে, দশটা বাজে! ঘড়ির দিকে তাকিয়েই আতঁকে উঠল আবদুল্লাহ্। চোখ ঢ়গড়ে আড়মোড়া ভেঙ্গেই ছুটল বাথরুমের দিকে। গতরাতে ঘুমুতে ঘুমুতে প্রায় তিনটা বেজে গিয়েছিল। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বইটা সম্পূর্ণ শেষ করেই ঘুমিয়েছিল। ওটা ওর একটা বদ অভ্যাস। কোন বই একবার হাতে পেলে সেটা সম্পূর্ণ পড়ে শেষ না করা অবদি ওর শান্তি নেই। বই পড়া খুব ভালো অভ্যাসের মধ্যে একটি। এটাকে ওর ক্ষেত্রে বদ অভ্যাস বলার কারন হচ্ছে, বই হাতে পেলে ও ওর সব রকম রুটিন ভেঙ্গে ফেলে। ওলট পালট হয়ে যায় সবকিছু। বই হাতে পেলেই খাওয়ায় অনিয়ম, নামাজে অনিয়ম, পড়ালেখা ও ঘুমেও অনিয়ম।
ওহ্, ফযর নামাজ কাযা হয়ে গেল, দাঁত মাজতে মাজতে ভাবল আবদুল্লাহ্।
ওর পুরো নাম মেহেদী আল আবদুল্লাহ্। বয়স প্রায় তেইশ ছুই ছুই। লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এমনিতেই বেশ ভালো ছাত্র ‘ও’। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেনীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই কম্পিউটার ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর শর্ট ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে ফেলে আবদুল্লাহ্। জীবনের লক্ষ্য আছে দুটো। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উপর উচ্চ শিক্ষা লাভ করা। এর ফলশ্রুতিতেই লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয় আবদুল্লাহ্।
দেখতে দেখতে দুটি বৎসর কেটে গেল। এখন তৃতীয় বর্ষে। ইতিমধ্যেই ওর বেশ কয়েকটি আবিষ্কার দেশের গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বও দারুন প্রশংসিত হয়েছে। তন্মধ্যে কাঠালের মত বড় লিচু, ছাগলের মত বড় মুরগি, পুকুরে পালন উপযোগী ইলিশ মাছ, ধান ও গমের সংযক্ত সংকর, অক্সিজেন বৃক্ষ ইত্যাদি জনপ্রিয়।
আবদুল্লাহর বাবা জনাব আবু বকর সিদ্দিক সাহেব ব্যবসায়ী মানুষ। বৎসরের অনেকটা সময়ই তিনি কাটিয়ে দেন বিদেশে। বাসায় সঙ্গ বলতে মা, ছোট বোন আর ভাবী। বড় ভাইয়াও ব্যবসার কাজে বাবার সঙ্গে থাকেন। আজ ‘ও’ বাসায় একা। বাবা ও মা হজ্বব্রত পালন করতে গেছেন সৌদি আরবে। ভাইয়া আছেন চায়নাতে, ব্যবসার কাজে। ভাবী ছোট বোনটিকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন তার বাবার বাড়ি। আগামী কাল চলে আসবেন। এমনিতেই ভোরে উঠে ফজর নামাজ আদায় করা ওর দৈনন্দিন কাজের মধ্যে একটি। আজ যে কি হল? ভাবতে ভাবতে ফ্রিজের কাছে চলে এল আবদুল্লাহ্। ফ্রিজে খাবার সব কিছুই রেডি করা আছে। শুধু বের করে মাইক্রোয়েভ ওভেন একটু গরম করে নিলেই হল। দুপুর বারোটায় আবার ভার্সিটিতে যেতে হবে।
কাযা ফজর নামাজ আদায় করে রুটি আর ভাজা গরুর মাংস দিয়ে নাস্তা সাড়ল আবদুল্লাহ্। নিজের পড়ার টেবিলে যখন বসল তখন ঘড়িতে বাজে পৌনে এগারোটা। মাথাটা ঝিমঝিম করছে আর শরীরের ম্যাজম্যাজানি তো আছেই। নতুন কিছু নয়, বিলম্ব করে ঘুম থেকে উঠার শাস্তি এটা।
হঠাৎ মনে হল, আজ প্রফেসর ড. জলিল স্যারের নিকট ওর নিজের তৈরী একটি সফটওয়্যার জমা দেয়ার কথা। সফটওয়্যারটি অনেকগুলো কাজ প্রায় একসঙ্গে সম্পন্ন করে ফলাফল প্রদর্শন করে। এটি এক ফোটা রক্ত থেকে গ্রুপিং, আরএইচ ফ্যাক্টর, কম্প্লিট ব্লাড কাউন্ট, ক্রস ম্যাচিং, রক্তে ত্রুটি, জিন বিন্যাস, জিন ত্রুটি ইত্যাদি বের করতে পারে। এমনকি জিন ম্যাচিংও করতে পারে এটি। গত রাতে দশটা নাগাদ সব কাজ শেষ করে রেখেছিল, এখন আরেকবার চেক দিলে ভালো হয়, ভাবল আবদুল্লাহ্। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির জন্য প্রয়োজন একটি কম্পিউটার ও একটি যন্ত্রের। যন্ত্রটি দেখতে অধুনা ব্লাড গ্লুকোজ মাপার যন্ত্রের মতই। যার দুটি প্রকোষ্ঠ থাকে। একটি প্রকোষ্ঠে একজনের রক্তের ফোটা সংয়ুক্ত স্লাইড ও অন্য আরেকটিতে জিন ম্যাচিংয়ের জন্য আরেকজনের রক্তের ফোটা সংযুক্ত স্লাইড প্রবেশ করানো হয়। তারপর এটি কম্পিউটারের সাথে একটি ইউএসবি ক্যবলের সাথে কানেক্ট করা হয়। যন্ত্রটির মধ্যেই একটি কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরন অংশ আছে। রক্তের প্রাথমিক সব তথ্যাবলি এর মধ্যেই বের হয়ে যায় তারপর সব ডেটা চলে যায় কম্পিউটারে। ঐখানে থাকা সফটওয়্যারটি রান করলেই কিছুক্ষনের মধ্যে খুটিনাটি সব তথ্যাদি কম্পিউটারের মনিটরে ভেসে উঠে।
আবদুল্লাহ্ আরেকবার নিজের রক্ত দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিল। উল্লেখ্য, যন্ত্রটি মূলত কাজ করে ইনপুট ডিভাইস হিসেবে, এর নাম দেয়া হয়েছে এম.এ. মাল্টিফাংশনাল ব্লাড ডিভাইস। এম. এ. দিয়ে মূলত মেহেদী আবদুল্লাহ্ বোঝানো হয়েছে। এর মধ্যে যে প্রোগ্রামটি দেয়া আছে সেটিও মূলত আবদুল্লাহর তৈরী। যাই হোক সফটওয়্যারটি পেন ড্রাইভে নিয়ে যন্ত্রটি নিজের ব্যাগে ভরে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ‘ও’। ভার্সিটিতে যেতে আধা ঘন্টা সময় লাগে। গ্যারাজ থেকে নিজের মটরসাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। বাসা নিয়ে চিন্তা নেই। বাসায় চুরি করা কারো সাধ্যের বাহিরে। জানালা বা ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে ঘরে ঢোকা এক কথায় অসম্ভব। বাড়ির প্রতিটি রুমে চালু আছে এ্যালার্ম। বাড়ির নীচে পাঁচজন দারোয়ান পাহাড়া দিচ্ছে। তাদের সাথে আছে তিনটি গ্রে-হাউন্ড। বাড়ির সদর দরজা একটিই। দরজায় লাগানো আছে সিকিউরিটি লক। বাহির থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইলেই তাকে দুটি পরীক্ষা দিতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে সিকিউরিটি কোড। বাড়ির প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা কোড। দরজায় নির্দিষ্ট সবুজ বাটনে চাপ দিলে একটি যান্ত্রিক কন্ঠ কোড জানতে চাইবে। কোড বলা হলে যদি ম্যাচ করে তাহলে আগন্তুককে দরজার পাশে থাকা দুটি ছোট গর্তে দু চোখ দিয়ে তাকাতে হবে। অর্থাৎ রেটিনা স্ক্যান হবে। রেটিনা স্ক্যান ম্যাচ হলে বাসার আভ্যন্তরের কলিং বেল বেজে উঠবে। ভেতর থেকে দরজা খুলতে হবে। উপরোক্ত পদ্ধতি দুটোর প্রথমটিতেই যদি কেউ অকৃতকার্য হয় তাহলে সাথে সাথে এ্যালার্ম বেজে উঠবে। এটা গেল বাসার সিকিউরিটি ব্যবস্থা।
ওর মটরসাইকেলও তিনধাপ সিকিউরিটির ব্যবস্থা আছে। প্রথমটি হল কোড, দ্বিতীয়টি ভয়েস আর তৃতীয়টি হল বৃদ্ধাঙ্গুলি ছাপ বা টিপসই। মটরসাইকেলের সামনের দিকে স্পিড ওয়াচের নীচে একটি ক্যালকুলেটরের মত যন্ত্র বসানো আছে। প্রথমে সেখানকার নির্দিষ্ট সবুজ বাটনটিতে চাপ দিয়ে নির্দিষ্ট কোড চাপতে হয় তারপর ভয়েস দিতে হবে অর্থাৎ আবদুল্লাহর কন্ঠে তার নিজের নাম বলতে হবে। এরপর টিপসই দিতে হবে। উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতির প্রথমটিতেই অকৃতকার্য হলে আবদুল্লাহর মোবাইলে একটি এসওএস মেসেজ চলে আসবে আর মটরসাইকেলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাবে। এই লক একমাত্র আবদুল্লাহই খুলতে পারবে তখন।
আবদুল্লাহ্ ভার্সিটিতে ঢুকেই প্রফেসর ড. জলিলের সাথে দেখা করে সফটওয়্যারটি ও যন্ত্রটি তাকে দিয়ে দিল এবং এর ব্যবহার দেখিয়ে দিল। এই যন্ত্রটির উপর একমাস ক্লিনিকাল টেস্ট চলবে তারপর অনুমোদন দেয়া হবে। অনুমোদন পেলে লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অগেনাইজেশন আবদুল্লাহকে প্রায় এক লক্ষ ডলারের সম্মানী প্রদান করবে। তবে যন্ত্রটির সর্বস্বত্ব থাকবে আবদুল্লাহর নামেই।
দুপুর আড়াইটার দিকে টিফিন। আবদুল্লাহ্, জসিম, মাহাবুব, আরিফ ও পলাশ ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। প্রসঙ্গ বারমুডা ট্রায়াঙ্গল।
আসলেই কি এ ধরনের কিছু আছে বলে তোদের মনে হয়? আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসা।
কেন থাকবে না, জসিম বলল।
জগতে এমন অনেক কিছু ঘটে যার বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যাখ্যা নেই, পলাশ বলল।
বুঝলাম, কিন্তু বিশাল বিশাল জাহাজ, বিমান যাত্রীসহ হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, কোন চিন্হ না রেখেই এটাতো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না, মাহাবুবের জবাব।
তোর বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে কিছু এসে যায় না। ব্যপারগুলোযে ঘটছে এটাই আসল কথা আর সত্য, আরিফের পাল্টা জবাব। এ দুটো ছেলে সারাক্ষন টম এন্ড জেরির মত একজন আরেকজনের পেছনে লেগেই থাকে।
দয়া করে তোরা থামবি, পলাশের অনুরোধ।
আচ্ছা, ঘটনাগুলো যে বা যার প্রভাবে ঘটছে তার দুটি কারন থাকতে পারে বলে বিশেষঞ্জরা মনে করেন, আবদুল্লাহ্ বলতে থাকল, প্রথমটি হচ্ছে ভিনগ্রহ কোন বুদ্ধিমান প্রানী এসব ঘটাচ্ছে আরেকটি হচ্ছে চুম্বকীয় প্রভাব। শেষোক্তটি আমার কাছে বেশ গ্রহনযোগ্য মনে হয়। চুম্বকীয় প্রভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব বিজ্ঞানীরা সেটা প্রমান করেছেন।
তুই ঠিকই বলেছিস, আমার কাছেও চুম্বকীয় প্রভাবকেই দায়ী মনে হয়, আরিফের জবাব, তাছাড়া ভীনগ্রহ প্রানীর ব্যপারে জোড়ালো কোন প্রমান পাওয়া যায় নি।
এই চুম্বকীয় প্রভাবটা কি মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সৃষ্টি নাকি? জসিমের জিজ্ঞাসা।
হতে পারে, আমারতো মনে হয় মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ দুটোই দায়ী এর পেছনে, আবদুল্লাহর জবাব। ভার্সিটিতে আসার পরপরই প্রফেসর ড. সালাম স্যারের সাথে কথা বলেছি। স্যারের মতে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মত কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। শুধু তাই না, উনি প্যারালেল ওয়ার্ল্ডের অস্তিত্বও বিশ্বাস করেন। উনি ভুত-প্রেত নিয়ে কার্ল সাগানের ব্যাখ্যাও বিশ্বাস করেন।
ভুত-প্রেত সম্পর্কে কার্ল সাগানের ব্যাখ্যাটা একটু শোনাতো, পলাশের প্রস্তাব।
কার্ল সাগানের মতে, আবদুল্লাহ্ বলতে আরম্ভ করল, আমরা হ্যালুসিনেশনের কারনে এ ধরনের ভুত-প্রেত জাতীয় কিছু দেখতে পারি, যা এক কথায় কল্পনা। এছাড়াও সুস্থ্য মস্তিষ্কে যদি এ রকম কিছু দেখি তাহলে সেটা সত্যিই দেখি।
তারমানে ভুত-প্রেত আছে? জসিমের জিজ্ঞাসা।
আরে সবটা শেষ করি আগে, আবদুল্লাহর জবাব।
হ্যা, হ্যা নে শেষ কর, মাহাবুব বলল।
ঐ জাতীয় যাই দেখি না কেন সেটা আসলে ভুত বা প্রেত নয়, আবদুল্লাহ্ বলতে থাকল, সেটা মানুষ এবং এগুলো ভবিষ্যৎ জেনারেশন থেকে এসেছে। মনে হয় একটু কঠিন করে ফেললাম। ভেঙ্গে বলছি। আজ থেকে এক হাজার বৎসর আগের কথা চিন্তা কর। এখনকার প্রযুক্তি আর তখনকার প্রযুক্তি কি এক রকম ছিল? না, ছিল না। এখনকার গাড়ি, বিমান, টি ভি, রেডিও, কম্পিউটারের কতা তখনকার মানুষের চিন্তাতেও আসে নি। ঘরে বসে আজ আমরা হাজার হাজার মাইল দূরের ঘটনাও লাইভ দেখতে পাচ্ছি। আগে যেখানে যেতে মাসের পর মাস সময় লাগত সেখানে এখন পৌছে যাচ্ছি কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে। এটা গেল বর্তমানের সাথে অতীতের তুলনা। এখন বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের তুলনা। আজ থেকে এক হাজার বৎসর পরের কথা চিন্তা কর। তখন যদি মানুষ আলোর গতিতে চলাচল করে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমরা টাইম মেশিনের কথা চিন্তা করছি, হতে পারে তখন টাইম মেশিন হবে তাদের সাধারন যানবাহন। এখন যেহেতু বলা হয়, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর প্রথম থেকে শেষ পযর্ন্ত সব কিছুই সৃষ্টি করে রেখেছেন, শুধু যত সময় যাবে ততই আবির্ভাব ঘটবে তাহলে ব্যপারটি কি রকম দাড়ায়? ভবিষ্যতের তারা যদি মনে করে যে, অতীতে গিয়ে দেখবে কে কি করছে, তাহলে কেমন হয়? হয়ত তখন এ ধরনের প্রযুক্তি বেরুবে যেটা টাইম মেশিনের মত। তো তারা বর্তমানে এল, সে বর্তমান মানুষদের দেখল, বর্তমানের মানুষেরা তাকে দেখে ভুত বা প্রেত মনে করল কারন তাদের আকৃতিতে এসেছে পরিবর্তন। তারা এল সত্যিই কিন্তু পৃথিবীর মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারবে না বা পৃথিবীর মানুষরাও তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যদি সেটা সম্ভব হতই, তাহলে অরাজকতা লেগে যেত, দেখা যেত পলাশ গিয়ে তার দাদার সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে। মারামারি অবস্থা। হয়ত দূর্ঘটনাবসত খুনই করে ফেলত। তার ফলে তার বাবার জন্ম হত না, তার বাবার জন্ম না হলে সেও তো জন্মাত না। আর এ কারনেই আমরা তাদের দেখতে পাই সত্যি, কিন্তু কিছুই করতে পারি না বা তারাও পারে না। এটাই হচ্ছে কার্ল সাগানের ব্যাখ্যা।
কিরে পলাশ, তোর কি মনে হয়, তুই তো দাদাকে….হা: হা: হা: আরিফের টিটকারী।
আরে দূর, আমার দাদাকে নয় আমি তোর দাদাকে…হা: হা: হা: তাতে পৃথিবীতে তোর মত একজন ইবলিশের আগমন বন্ধ থাকত, পলাশের টিটকারোত্তর।
ব্যটা শোন, তুই যেই টাইম মেশিনে চড়ে আসতি সেটার সব নাটবল্টু খুলে আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিতাম বুঝেছিস? আরিফের পুনরায় টিটকারী।
তোরা চুপ কর, আবদুল্লাহ্ বলল, আমি প্যারালেল ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে বেশ আগ্রহী। প্যারালেল ওয়ার্ল্ড কখন পৃথিবীর কোন অঞ্চল দিয়ে যায় সেটা কেউই বলতে পারে না। আমার ওটার মধ্যে যাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, দেখা দরকার ব্যপারটা আসলে কি? হতে পারে সেখানকার প্রযুক্তি বর্তমানের পৃথিবীর প্রযুক্তি থেকেও কয়েক হাজার বৎসর এগিয়ে।
তোর কথাগুলো পাগলের প্রলাপের মত শোনাচ্ছে, জসিম বলতে লাগল, আরে ঐখানে যাওয়া কি এতই সহজ, আর সেখান থেকে কারো ফিরে আসারও তো কোন প্রমান নেই।
এমনও তো হতে পারে সেখান থেকে কেউ ফিরে আসতে চায় না, হয়ত অবস্থাটাই এমন যে, সেখানে যা ইচ্ছে তাই পাওয়া যায় বা করা যায়, সবকিছু একেবারে মনের ইচ্ছাধীন আবদুল্লাহর জবাব।
হ্যা সেটা হওয়াও অসম্ভব না, জসিম বলল।
চল টিফিন শেষ, মাহাবুব সবাইকে তাড়া লাগাল। ছেলেরা সবাই ক্লাসরুমে চলে এল।
রাতে বাসায় নিজের জড়ার টেবিলের সামনে আবদুল্লাহ্ বসে আছে। মাথায় একটাই চিন্তা, প্যারালেল ওয়ার্ল্ড। কিভাবে সেখানে যাওয়া সম্ভব? প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে যাওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি ওকে গ্রাস করল। অনেক ভেবে চিন্তে কিছু তথ্য ও একত্র করতে সক্ষম হল।
১। প্যারালেল ওয়ার্ল্ডের জন্য ত্রিভুজ আকৃতির একটি পরিবেশ প্রয়োজন যা কৃত্রিম ট্রায়াঙ্গলের মত কাজ করবে।
২। সবুজাভ স্বচ্ছ কাচ বেষ্ঠিত হলে উত্তম। সবুজাভ হওয়ার কারন হচ্ছে সবুজ প্রকৃতির প্রধান উপাদান বৃক্ষের নিদর্শন।
নাহ্, এটা কোন যুক্তিই হল না, নিজের কাছেই উদ্ভট লাগছে, আবদুল্লাহ ভাবল।
৩। চুম্বকীয় প্রভাব।
৪। মস্তিষ্কের নিউরন থেকে কার্বন, অক্সিজেন প্রভৃতি দ্বারা প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি বাহিরে প্রেরন করা, যা চুম্বকীয় প্রভাবের সাথে মিশে এক ধরনের মিশ্র প্রভাব সৃষ্টি করবে।
ব্যাস এতটুকু করে চেষ্টা করা যেতে পারে। উপরের প্রথম ও দ্বিতীয়টি একই সাথে করা সম্ভব। কাচের তৈরী ত্রিভুজ আকৃতির একটি ঘর তৈরী করে তার মধ্যে কৃত্রিম গ্রীন হাউজ তৈরী করলেই সবুজাভ পরিবেশ সৃষ্টি হবে। চুম্বকীয় প্রভাবের ব্যবস্থা করবেন ড. সালাম স্যার। উনি লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। আর চতুর্থটিও সম্ভব। আবদুল্লাহ্ মেডিটেশনে নিয়মিত।
কাল সকালে ভোরে উঠে প্রথম ও দ্বিতীয়টির ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে ইনশাআল্লাহ, আবদুল্লাহ্ ভাবল। স্টাডি, নামাজ ও রাতের খাবার খেয়ে ও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। ভোরে ফজর নামাজ পড়েই কম্পিউটারের সামনে বসে একটি গ্রীন হাউসের সর্বনিম্ন মাপ বের করল ‘ও’ ইন্টারনেট থেকে। এরপর ঐ মাপের চারভাগের একভাগ বের করে ‘ও’ কাচ কিনে আনাল। দারোয়ানদের একজনকে দিয়ে একজন রাজমিস্ত্রিকে ডেকে এনে মাপ বুঝিয়ে দিয়ে ত্রিভুজ আকৃতির একটি হাউজ তৈরী করাল। এবার গাছ সংগ্রহের পালা। ঘড়িতে তখন সকাল এগারোটা। গাছ আজ আর কেনা হবে না। ভার্সিটিতে ছুটল আবদুল্লাহ্।
ভার্সিটিতে এসেই প্রফেসর ড. সালাম স্যারের সাথে দেখা করল আবদুল্লাহ্। স্যার জানালেন চৌম্বকীয় প্রভাব সমৃদ্ধ যন্ত্র দুই দিনের মধ্যেই তৈরী করে দেয়া সম্ভব। সকল খরচ বহন করবে আবদুল্লাহ্।
পরের দুই দিন কাটল খুব ব্যস্ততায়। বিভিন্ন রকম গাছ গাছালি এনে কৃত্রিম ট্রায়াঙ্গলকে তৈরী করল গ্রীন হাউজে। তৃতীয় দিনের মাথায় চুম্বকীয় প্রভাব সম্বলিত তিনটি দন্ত এনে ট্রায়াঙ্গলের তিন কোনায় বসিয়ে দেয়া হল। দন্ড তিনটিই চুম্বকের তৈরী। তার উপর তামার তার দিয়ে কয়েলের মত পেচানো। সমস্ত দন্তটি আগাগোড়া ফেল্ট দিয়ে মোড়া, যাতে বিদ্যুৎ বাহিরে পরিবাহিত হতে না পারে। প্রতিটি দন্ড একটির সাথে অন্যটি আবরনী তার দিয়ে যুক্ত। আবদুল্লাহ্ সব আয়োজন করেছে তাদের বাড়ির পেছনে। দারোয়ানরা সবাই বেশ কৌতুহলী তবে আবদুল্লাহর কঠোর নিষেধ আছে বাড়ির পেছনে কেউই আসতে পারবে না টানা তিনদিন। দারোয়ান, ছোট বোন বা ভাবি কেউই না। ‘ও’ বলেছে কেউ এলেই ওর পরীক্ষার সমস্যা হবে। ভার্সিটি থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিল আবদুল্লাহ্।
দিনটি শুক্রবার। রাতের খাবার খেয়ে এবং নামাজ আদায় করে চলে এল গ্রীন হাউজে। চুম্বকীয় দন্ডগুলোতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়া হয়েছে। বাড়ীর পেছনের বৈদ্যুতিক বাতি থেকেই কিছু আলো এসে পড়েছে গ্রীন হা্উজে। একরকম আলো আধারীর মত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মেডিটেশনের জন্য উৎকৃষ্ট। আবদুল্লাহ্ পদ্মাশনে বসে পড়ল। এমনিতেই শরীর কেমন যেন ঝিরঝির করছে। মনে হয় চুম্বকীয় প্রভাবের ফল। কতক্ষন মেডেটেশনে ছিল বলতে পারবে না, হঠাৎই চোখে তীব্র আলোর উপস্থিতি অনুভব করল। তারপরেও চোখ খুলল না। হঠাৎ কাধ ধরে ঝাকুনি। এবার চোখ খুলতে হল। একটি প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে আছে আবদুল্লাহ্। এক উজ্জল আলো চারদিকে। বর্তমানের এনার্জি ল্যাম্পগুলো থেকেও কয়েকশত গুন উজ্জল কিন্তু দৃষ্টি সয়ে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটা এয়ারপোর্টের ইমাগ্রেশন সেন্টারের মত। আশপাশের মানুষজন সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। পুরুষরা সবাই স্যুট পরিহিত আর মহিলারা বোরখায় আবৃত। ওকে যে ঝাকাচ্ছিল তারও স্যুট পরিহিত কিন্তু দুই কাধে ব্যাজ লাগানো। বোজা গেল উনি সামরিক দায়িত্ব পালনে রত।
জনাব আপনার নাম? শুদ্ধ বাংলায় জিজ্ঞেস করল লোকটি।
আবদুল্লাহ্, মেহেদী আল আবদুল্লাহ্, নিজের নাম বলল ‘ও’।
প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে স্বাগতম। আপনি কোথায় যেতে চান? এখানে যে কেউ যেকোন সময় যেকোন স্থানে যেতে পারে, তার কোন ভাড়া বা কোন অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না একমাস পযর্ন্ত।
আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষন ভাবল, সম্ভবত আমি এখন বাংলাদেশেই আছি, বর্তমানে সর্বাপেক্ষা উন্নত প্রযুক্তি হচ্ছে আমেরিকান প্রযুক্তি। তাই সেখানে যাওয়াই স্থির করল ‘ও’।
লোকটি নিজের নাম জানাল আবুল কাশেম। আবদুল্লাহকে প্রথমে একটি ওয়াশ রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হল। সেকানে কয়েকটি রোবট বসে গল্প করছিল। দেখতে হুবহু মানুষের মত। সকলেই পুরুষের বেশে। একধরনের সুগন্ধিযুক্ত পানি দিয়ে তারা আবদুল্লাহকে গোসল করিয়ে স্যুট পড়িয়ে দিল। এরপর আরেকটি রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হল। এখানেও কয়েকটি রোবট। ‘ও’কে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে কাচ দিয়ে ঘীরে দেয়া হল। সম্পূর্ন রুম অন্ধকার করে দিয়ে এক ধরনের লেজার রশ্মি ছড়িয়ে দেয়া হল গোটা রুমময়। এ অবস্থা মিনিট পাচেক স্থায়ী হল। এরপর ’ও’কে আবার মি. আবুল কাশেমের হাতে হস্তান্তর করা হল।
এসব কি হল? আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসা।
প্রথম রুমে আপনার সম্পূর্ন দেহ জীবানুমুক্ত করে জীবানুমুক্ত পোষাক পড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় রুমে লেজার রশ্মি দিয়ে আপনার দেহের সকল রোগ জীবানু ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আপনি এখন নিরোগ। প্যারালেল ওয়ার্ল্ড সব ধরনের ধুলোবালি ও রোগ জীবানু মুক্ত। মি. কাশেম আবদুল্লাহকে একটি যন্ত্রে বসিয়ে দিলেন। যেটি দেখতে অনেকটা মটর সাইকেলের মতই। বলা যায় একটি চেয়ারের সাথে মটর সাইকেলের সামনের অংশ জুড়ে দেয়া হয়েছে। কোন হ্যান্ডেল বা স্টীয়ারিং নেই। শুধু একিট স্ক্রীন দেয়া। যা দুটি অংশে বিভক্ত। একটি অংশে যানটির সকল তথ্যাদি দেখা যাচ্ছে, অন্য আরেকটি অংশে ম্যাপ। মি. কাশেম, আবদুল্লাহকে সব শিখিয়ে দিলেন।
আবদুল্লাহ স্ত্রিনের দিকে মুখ এনে বলল, ইউএসএ। সাথে সাথে আমেরিকার ম্যাপ চলে এল। এবার ও বলল ওয়াশিংটন ডিসি। বলতে বলতেই ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি ঝাকি খেল। ব্যাস সামনে থেকে সবকিছু উধাও। ‘ও’ নিজেকে অন্য আরেকটি প্ল্যাটফর্মে আবিষ্কার করল। সাদা চামড়ার একজন পুলিশ এসে ওকে বলল, ওয়েলকাম টু ওয়াশিংটন ডিসি। দিস ইজ প্ল্যাটফর্ম ওয়ান ও ওয়ান। আই এম এন্ড্রু হল। নাইস টু মিট ইউ মি. আবদুল্লাহ্।
আবদুল্লাহ্ যে যন্ত্রটিতে বসে আসে সেখানে একটি অংশ থেকে ভয়েস কনভার্টার এক্টিভ হওয়ার কমান্ড দিল। হোস্ট ল্যাংগুয়েজ বাংলা আর গেস্ট ল্যাংগুয়েজ ইংরেজী। অর্থাৎ ‘ও’ বাংলা বলবে অন্যরা শুনবে ইংরেজীতে। পুলিশ কর্মিটি জানাল আবদুল্লাহ্ ইচ্ছে করলে যেকোন স্থানে ঘুরে দেখতে পারে একমাস পযর্ন্ত। খেতে বা থাকতে হলে যেকোন হোটেলে ঢুকে পড়লেই হল। ওর স্যুটে সব নিয়ন্ত্রনের মাধ্যম দেয়া আছে। শুধু কমান্ড দিলেই হল। ওর বাহনটির কোড হচ্ছে ‘আবদুল্লাহ্ বিডি ওয়ান হানড্রেড সিক্সটিন। ওর কোথাও যেতে ইচ্ছে করলে এই কোডটি বললেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানটি ওর সামনে চলে আসবে। ভয়েস কনভার্টার স্যুটের মধ্যেই দেয়া আছে।
প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে আবদুল্লাহর কাজ হচ্ছে আমেরিকার চিকিৎসা প্রযুক্তি দেখা প্রথমে। তারপর একে একে বাকীগুলো। তারপর পৃথিবীতে ফেরত আসা। এখানে থাকার কোনরূপ ইচ্ছেই নেই ওর। কেউ ফেরত না যাওয়ার কারনটি ও এখন বুঝতে পারছে। এখানে রোগ বলতে কোন শব্দই নেই। খাবার নিয়ে চিন্তা নেই। সবকিছু নিয়ন্ত্রন করে দেশের সরকার। সকলেই কোন না কোন গবেষনার কাজে জড়িত। আবদুল্লাহকে একমাস পর ওর পছন্দঅনুযায়ী এ রকম কোন একটি গবেষনাগারে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। সরকার সবার মৌলিক অধিকারগুলো বিনামূল্যে সরবরাহ করে। এই পৃথিবীতে নেই ভুমিকম্প বা কোন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রভাব। দিন রাত্রি এখানে সমান সমান। আবদুল্লাহ আমেরিকান একজনের সাথে কথা বলল। লোকটি জানাল যে, এই প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে কেউ ত্রিশ মিনিটের বেশী অবস্থান করলেই আর ফেরত যেতে পারে না। ফেরত যাওয়ার যদি পদ্ধতি থেকেও থাকে সেক্ষেত্রে সেটা আর কাজ করবে না। আবদুল্লাহ্ ঘড়ি দেখল। ‘ও’ এখানে এসেছে প্রায় আঠার মিনিট। লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে কমান্ড দিয়ে ওর বাহনটি এনে চলে এল সেই প্ল্যাটফর্মে। যেটা বাংলাদেশে অবস্থিত। ‘ও’ বুঝে গেছে সমগ্র পৃথিবীর এখন চিকিৎসা পদ্ধতি বলতে একমাত্র লেজার রশ্মি। অন্য প্রযুক্তিগুলো দেখা সম্ভব না। সময় নেই। এই লেজার রম্মির তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে এর মধ্যকার উপাদান গুলি কি কি। পুনরায় মি. কাশেমের সাথে দেখা করল আর জানাল লেজার রশ্মিটির কথা ও পৃথিবীতে ফেরত যাওয়ার কথা। পৃথিবী থেকে একজন এসে আবার ফেরত যেতে চাইছে, এটা শুনে তিনি যারপরনাই অবাক হলেন। পৃথিবীতে যেতে চাইলে অত কিছু করতে হয় না, শুধু নিজের পরিহিত স্যুটের লাল বাটনটি চাপ দিলেই হল। ত্রিশ মিনিট পর এই বাটনটি আর কাজ করবে না। আবদুল্লাহ্ ঘড়ি দেখল। হাতে এখনও পাচ মিনিট বাকী আছে। ’ও’ আবারও লেজার রশ্মি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। ভদ্রলোক জানালেন এ রশ্মিটি প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরী। তা যথার্থ বলতে পারবে যারা এর গবেষনার কাজে জড়িত। আসলে এই পৃথিবীর সব প্রযুক্তিই প্রাকৃতিকে গবেষনা করে বের করা। প্রকৃতিই সব।
আর মাত্র দুই মিনিট সময় বাকী আছে। শেষ প্রশ্নটি করল আবদুল্লাহ্। আচ্ছা স্যার, আমার শরীর পৃথিবীতে গিয়েও কি নিরোগ থাকবে?
মি. কাশেম জানালেন, পৃথিবীতে যাওয়ার পর পৃথিবীর রোগজীবানু দ্বারা ’ও’ আবার আক্রান্ত হবে। মি. কাশেমকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে আবদুল্লাহ্ লাল বাটনে চাপ দিল। আবারও ঝিমঝিমানি এবং চিরচেনা পরিবেশ। ‘ও’ বসে আছে সেই গ্রীন হাউজটিতেই। খুব বেশিতো আর সময় কাটেনি। বড়জোড় চল্লিশ কি পঞ্চাশ মিনিট। আসলেই কি ও প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে গিয়েছিল নাকি সবটাই মেডিটেশনের ফল? কথা একটাই প্রকৃতিতেই রয়েছে সবকিছুর সমাধান। আবদুল্লাহ্ ওর রুমে চলে এল। ভাবল আর যাই হোক, ওর এই রিসার্চের কথা গোপন রাখতে হবে। তা না হলে পৃথিবীর সকলেই প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে যেতে চাইবে। অফুরন্ত সুখশান্তি কে না চায়? ওহ্ ভুল হয়ে গেছে, মি. কাশেমকে জিজ্ঞেস করা হয়নি প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে মৃত্যু আছে কিনা?
যাই হোক, কাল কলেজে যেতে হবে। এক সপ্তাহ ছুটি কাটানো হল না। আমিই বোধহয় প্রথম মানুষ যে প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে গিয়েও ফিরে এলাম, ভাবতে ভাবতে বিছানায় পিঠ ঠেকাল আবদুল্লাহ্।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন সায়েন্স ফিকশন : প্যারালেল ওয়ার্ল্ড
ওহ্, ফযর নামাজ কাযা হয়ে গেল, দাঁত মাজতে মাজতে ভাবল আবদুল্লাহ্।
ওর পুরো নাম মেহেদী আল আবদুল্লাহ্। বয়স প্রায় তেইশ ছুই ছুই। লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। এমনিতেই বেশ ভালো ছাত্র ‘ও’। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেনীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় গোল্ডেন এ প্লাস। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরপরই কম্পিউটার ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের উপর শর্ট ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করে ফেলে আবদুল্লাহ্। জীবনের লক্ষ্য আছে দুটো। জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের উপর উচ্চ শিক্ষা লাভ করা। এর ফলশ্রুতিতেই লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হয় আবদুল্লাহ্।
দেখতে দেখতে দুটি বৎসর কেটে গেল। এখন তৃতীয় বর্ষে। ইতিমধ্যেই ওর বেশ কয়েকটি আবিষ্কার দেশের গন্ডি পেড়িয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বও দারুন প্রশংসিত হয়েছে। তন্মধ্যে কাঠালের মত বড় লিচু, ছাগলের মত বড় মুরগি, পুকুরে পালন উপযোগী ইলিশ মাছ, ধান ও গমের সংযক্ত সংকর, অক্সিজেন বৃক্ষ ইত্যাদি জনপ্রিয়।
আবদুল্লাহর বাবা জনাব আবু বকর সিদ্দিক সাহেব ব্যবসায়ী মানুষ। বৎসরের অনেকটা সময়ই তিনি কাটিয়ে দেন বিদেশে। বাসায় সঙ্গ বলতে মা, ছোট বোন আর ভাবী। বড় ভাইয়াও ব্যবসার কাজে বাবার সঙ্গে থাকেন। আজ ‘ও’ বাসায় একা। বাবা ও মা হজ্বব্রত পালন করতে গেছেন সৌদি আরবে। ভাইয়া আছেন চায়নাতে, ব্যবসার কাজে। ভাবী ছোট বোনটিকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন তার বাবার বাড়ি। আগামী কাল চলে আসবেন। এমনিতেই ভোরে উঠে ফজর নামাজ আদায় করা ওর দৈনন্দিন কাজের মধ্যে একটি। আজ যে কি হল? ভাবতে ভাবতে ফ্রিজের কাছে চলে এল আবদুল্লাহ্। ফ্রিজে খাবার সব কিছুই রেডি করা আছে। শুধু বের করে মাইক্রোয়েভ ওভেন একটু গরম করে নিলেই হল। দুপুর বারোটায় আবার ভার্সিটিতে যেতে হবে।
কাযা ফজর নামাজ আদায় করে রুটি আর ভাজা গরুর মাংস দিয়ে নাস্তা সাড়ল আবদুল্লাহ্। নিজের পড়ার টেবিলে যখন বসল তখন ঘড়িতে বাজে পৌনে এগারোটা। মাথাটা ঝিমঝিম করছে আর শরীরের ম্যাজম্যাজানি তো আছেই। নতুন কিছু নয়, বিলম্ব করে ঘুম থেকে উঠার শাস্তি এটা।
হঠাৎ মনে হল, আজ প্রফেসর ড. জলিল স্যারের নিকট ওর নিজের তৈরী একটি সফটওয়্যার জমা দেয়ার কথা। সফটওয়্যারটি অনেকগুলো কাজ প্রায় একসঙ্গে সম্পন্ন করে ফলাফল প্রদর্শন করে। এটি এক ফোটা রক্ত থেকে গ্রুপিং, আরএইচ ফ্যাক্টর, কম্প্লিট ব্লাড কাউন্ট, ক্রস ম্যাচিং, রক্তে ত্রুটি, জিন বিন্যাস, জিন ত্রুটি ইত্যাদি বের করতে পারে। এমনকি জিন ম্যাচিংও করতে পারে এটি। গত রাতে দশটা নাগাদ সব কাজ শেষ করে রেখেছিল, এখন আরেকবার চেক দিলে ভালো হয়, ভাবল আবদুল্লাহ্। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটির জন্য প্রয়োজন একটি কম্পিউটার ও একটি যন্ত্রের। যন্ত্রটি দেখতে অধুনা ব্লাড গ্লুকোজ মাপার যন্ত্রের মতই। যার দুটি প্রকোষ্ঠ থাকে। একটি প্রকোষ্ঠে একজনের রক্তের ফোটা সংয়ুক্ত স্লাইড ও অন্য আরেকটিতে জিন ম্যাচিংয়ের জন্য আরেকজনের রক্তের ফোটা সংযুক্ত স্লাইড প্রবেশ করানো হয়। তারপর এটি কম্পিউটারের সাথে একটি ইউএসবি ক্যবলের সাথে কানেক্ট করা হয়। যন্ত্রটির মধ্যেই একটি কেন্দ্রীয় প্রক্রিয়াকরন অংশ আছে। রক্তের প্রাথমিক সব তথ্যাবলি এর মধ্যেই বের হয়ে যায় তারপর সব ডেটা চলে যায় কম্পিউটারে। ঐখানে থাকা সফটওয়্যারটি রান করলেই কিছুক্ষনের মধ্যে খুটিনাটি সব তথ্যাদি কম্পিউটারের মনিটরে ভেসে উঠে।
আবদুল্লাহ্ আরেকবার নিজের রক্ত দিয়ে সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিল। উল্লেখ্য, যন্ত্রটি মূলত কাজ করে ইনপুট ডিভাইস হিসেবে, এর নাম দেয়া হয়েছে এম.এ. মাল্টিফাংশনাল ব্লাড ডিভাইস। এম. এ. দিয়ে মূলত মেহেদী আবদুল্লাহ্ বোঝানো হয়েছে। এর মধ্যে যে প্রোগ্রামটি দেয়া আছে সেটিও মূলত আবদুল্লাহর তৈরী। যাই হোক সফটওয়্যারটি পেন ড্রাইভে নিয়ে যন্ত্রটি নিজের ব্যাগে ভরে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল ‘ও’। ভার্সিটিতে যেতে আধা ঘন্টা সময় লাগে। গ্যারাজ থেকে নিজের মটরসাইকেলটি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। বাসা নিয়ে চিন্তা নেই। বাসায় চুরি করা কারো সাধ্যের বাহিরে। জানালা বা ভেন্টিলেটর ভেঙ্গে ঘরে ঢোকা এক কথায় অসম্ভব। বাড়ির প্রতিটি রুমে চালু আছে এ্যালার্ম। বাড়ির নীচে পাঁচজন দারোয়ান পাহাড়া দিচ্ছে। তাদের সাথে আছে তিনটি গ্রে-হাউন্ড। বাড়ির সদর দরজা একটিই। দরজায় লাগানো আছে সিকিউরিটি লক। বাহির থেকে কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইলেই তাকে দুটি পরীক্ষা দিতে হবে। প্রথমটি হচ্ছে সিকিউরিটি কোড। বাড়ির প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা কোড। দরজায় নির্দিষ্ট সবুজ বাটনে চাপ দিলে একটি যান্ত্রিক কন্ঠ কোড জানতে চাইবে। কোড বলা হলে যদি ম্যাচ করে তাহলে আগন্তুককে দরজার পাশে থাকা দুটি ছোট গর্তে দু চোখ দিয়ে তাকাতে হবে। অর্থাৎ রেটিনা স্ক্যান হবে। রেটিনা স্ক্যান ম্যাচ হলে বাসার আভ্যন্তরের কলিং বেল বেজে উঠবে। ভেতর থেকে দরজা খুলতে হবে। উপরোক্ত পদ্ধতি দুটোর প্রথমটিতেই যদি কেউ অকৃতকার্য হয় তাহলে সাথে সাথে এ্যালার্ম বেজে উঠবে। এটা গেল বাসার সিকিউরিটি ব্যবস্থা।
ওর মটরসাইকেলও তিনধাপ সিকিউরিটির ব্যবস্থা আছে। প্রথমটি হল কোড, দ্বিতীয়টি ভয়েস আর তৃতীয়টি হল বৃদ্ধাঙ্গুলি ছাপ বা টিপসই। মটরসাইকেলের সামনের দিকে স্পিড ওয়াচের নীচে একটি ক্যালকুলেটরের মত যন্ত্র বসানো আছে। প্রথমে সেখানকার নির্দিষ্ট সবুজ বাটনটিতে চাপ দিয়ে নির্দিষ্ট কোড চাপতে হয় তারপর ভয়েস দিতে হবে অর্থাৎ আবদুল্লাহর কন্ঠে তার নিজের নাম বলতে হবে। এরপর টিপসই দিতে হবে। উপরোক্ত তিনটি পদ্ধতির প্রথমটিতেই অকৃতকার্য হলে আবদুল্লাহর মোবাইলে একটি এসওএস মেসেজ চলে আসবে আর মটরসাইকেলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক হয়ে যাবে। এই লক একমাত্র আবদুল্লাহই খুলতে পারবে তখন।
আবদুল্লাহ্ ভার্সিটিতে ঢুকেই প্রফেসর ড. জলিলের সাথে দেখা করে সফটওয়্যারটি ও যন্ত্রটি তাকে দিয়ে দিল এবং এর ব্যবহার দেখিয়ে দিল। এই যন্ত্রটির উপর একমাস ক্লিনিকাল টেস্ট চলবে তারপর অনুমোদন দেয়া হবে। অনুমোদন পেলে লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও ওয়ার্ল্ড হেলথ অগেনাইজেশন আবদুল্লাহকে প্রায় এক লক্ষ ডলারের সম্মানী প্রদান করবে। তবে যন্ত্রটির সর্বস্বত্ব থাকবে আবদুল্লাহর নামেই।
দুপুর আড়াইটার দিকে টিফিন। আবদুল্লাহ্, জসিম, মাহাবুব, আরিফ ও পলাশ ক্যান্টিনে বসে আড্ডা দিচ্ছে। প্রসঙ্গ বারমুডা ট্রায়াঙ্গল।
আসলেই কি এ ধরনের কিছু আছে বলে তোদের মনে হয়? আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসা।
কেন থাকবে না, জসিম বলল।
জগতে এমন অনেক কিছু ঘটে যার বিজ্ঞানসম্মত কোন ব্যাখ্যা নেই, পলাশ বলল।
বুঝলাম, কিন্তু বিশাল বিশাল জাহাজ, বিমান যাত্রীসহ হাওয়া হয়ে যাচ্ছে, কোন চিন্হ না রেখেই এটাতো বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না, মাহাবুবের জবাব।
তোর বিশ্বাস অবিশ্বাস দিয়ে কিছু এসে যায় না। ব্যপারগুলোযে ঘটছে এটাই আসল কথা আর সত্য, আরিফের পাল্টা জবাব। এ দুটো ছেলে সারাক্ষন টম এন্ড জেরির মত একজন আরেকজনের পেছনে লেগেই থাকে।
দয়া করে তোরা থামবি, পলাশের অনুরোধ।
আচ্ছা, ঘটনাগুলো যে বা যার প্রভাবে ঘটছে তার দুটি কারন থাকতে পারে বলে বিশেষঞ্জরা মনে করেন, আবদুল্লাহ্ বলতে থাকল, প্রথমটি হচ্ছে ভিনগ্রহ কোন বুদ্ধিমান প্রানী এসব ঘটাচ্ছে আরেকটি হচ্ছে চুম্বকীয় প্রভাব। শেষোক্তটি আমার কাছে বেশ গ্রহনযোগ্য মনে হয়। চুম্বকীয় প্রভাবে এ ধরনের ঘটনা ঘটানো সম্ভব বিজ্ঞানীরা সেটা প্রমান করেছেন।
তুই ঠিকই বলেছিস, আমার কাছেও চুম্বকীয় প্রভাবকেই দায়ী মনে হয়, আরিফের জবাব, তাছাড়া ভীনগ্রহ প্রানীর ব্যপারে জোড়ালো কোন প্রমান পাওয়া যায় নি।
এই চুম্বকীয় প্রভাবটা কি মহাকর্ষ বলের প্রভাবে সৃষ্টি নাকি? জসিমের জিজ্ঞাসা।
হতে পারে, আমারতো মনে হয় মহাকর্ষ ও অভিকর্ষ দুটোই দায়ী এর পেছনে, আবদুল্লাহর জবাব। ভার্সিটিতে আসার পরপরই প্রফেসর ড. সালাম স্যারের সাথে কথা বলেছি। স্যারের মতে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মত কৃত্রিম পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। শুধু তাই না, উনি প্যারালেল ওয়ার্ল্ডের অস্তিত্বও বিশ্বাস করেন। উনি ভুত-প্রেত নিয়ে কার্ল সাগানের ব্যাখ্যাও বিশ্বাস করেন।
ভুত-প্রেত সম্পর্কে কার্ল সাগানের ব্যাখ্যাটা একটু শোনাতো, পলাশের প্রস্তাব।
কার্ল সাগানের মতে, আবদুল্লাহ্ বলতে আরম্ভ করল, আমরা হ্যালুসিনেশনের কারনে এ ধরনের ভুত-প্রেত জাতীয় কিছু দেখতে পারি, যা এক কথায় কল্পনা। এছাড়াও সুস্থ্য মস্তিষ্কে যদি এ রকম কিছু দেখি তাহলে সেটা সত্যিই দেখি।
তারমানে ভুত-প্রেত আছে? জসিমের জিজ্ঞাসা।
আরে সবটা শেষ করি আগে, আবদুল্লাহর জবাব।
হ্যা, হ্যা নে শেষ কর, মাহাবুব বলল।
ঐ জাতীয় যাই দেখি না কেন সেটা আসলে ভুত বা প্রেত নয়, আবদুল্লাহ্ বলতে থাকল, সেটা মানুষ এবং এগুলো ভবিষ্যৎ জেনারেশন থেকে এসেছে। মনে হয় একটু কঠিন করে ফেললাম। ভেঙ্গে বলছি। আজ থেকে এক হাজার বৎসর আগের কথা চিন্তা কর। এখনকার প্রযুক্তি আর তখনকার প্রযুক্তি কি এক রকম ছিল? না, ছিল না। এখনকার গাড়ি, বিমান, টি ভি, রেডিও, কম্পিউটারের কতা তখনকার মানুষের চিন্তাতেও আসে নি। ঘরে বসে আজ আমরা হাজার হাজার মাইল দূরের ঘটনাও লাইভ দেখতে পাচ্ছি। আগে যেখানে যেতে মাসের পর মাস সময় লাগত সেখানে এখন পৌছে যাচ্ছি কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে। এটা গেল বর্তমানের সাথে অতীতের তুলনা। এখন বর্তমানের সাথে ভবিষ্যতের তুলনা। আজ থেকে এক হাজার বৎসর পরের কথা চিন্তা কর। তখন যদি মানুষ আলোর গতিতে চলাচল করে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। আমরা টাইম মেশিনের কথা চিন্তা করছি, হতে পারে তখন টাইম মেশিন হবে তাদের সাধারন যানবাহন। এখন যেহেতু বলা হয়, আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর প্রথম থেকে শেষ পযর্ন্ত সব কিছুই সৃষ্টি করে রেখেছেন, শুধু যত সময় যাবে ততই আবির্ভাব ঘটবে তাহলে ব্যপারটি কি রকম দাড়ায়? ভবিষ্যতের তারা যদি মনে করে যে, অতীতে গিয়ে দেখবে কে কি করছে, তাহলে কেমন হয়? হয়ত তখন এ ধরনের প্রযুক্তি বেরুবে যেটা টাইম মেশিনের মত। তো তারা বর্তমানে এল, সে বর্তমান মানুষদের দেখল, বর্তমানের মানুষেরা তাকে দেখে ভুত বা প্রেত মনে করল কারন তাদের আকৃতিতে এসেছে পরিবর্তন। তারা এল সত্যিই কিন্তু পৃথিবীর মানুষের কোন ক্ষতি করতে পারবে না বা পৃথিবীর মানুষরাও তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবে না। যদি সেটা সম্ভব হতই, তাহলে অরাজকতা লেগে যেত, দেখা যেত পলাশ গিয়ে তার দাদার সাথে ঝগড়া লাগিয়ে দিয়েছে। মারামারি অবস্থা। হয়ত দূর্ঘটনাবসত খুনই করে ফেলত। তার ফলে তার বাবার জন্ম হত না, তার বাবার জন্ম না হলে সেও তো জন্মাত না। আর এ কারনেই আমরা তাদের দেখতে পাই সত্যি, কিন্তু কিছুই করতে পারি না বা তারাও পারে না। এটাই হচ্ছে কার্ল সাগানের ব্যাখ্যা।
কিরে পলাশ, তোর কি মনে হয়, তুই তো দাদাকে….হা: হা: হা: আরিফের টিটকারী।
আরে দূর, আমার দাদাকে নয় আমি তোর দাদাকে…হা: হা: হা: তাতে পৃথিবীতে তোর মত একজন ইবলিশের আগমন বন্ধ থাকত, পলাশের টিটকারোত্তর।
ব্যটা শোন, তুই যেই টাইম মেশিনে চড়ে আসতি সেটার সব নাটবল্টু খুলে আমি ডাস্টবিনে ফেলে দিতাম বুঝেছিস? আরিফের পুনরায় টিটকারী।
তোরা চুপ কর, আবদুল্লাহ্ বলল, আমি প্যারালেল ওয়ার্ল্ড সম্পর্কে বেশ আগ্রহী। প্যারালেল ওয়ার্ল্ড কখন পৃথিবীর কোন অঞ্চল দিয়ে যায় সেটা কেউই বলতে পারে না। আমার ওটার মধ্যে যাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছে, দেখা দরকার ব্যপারটা আসলে কি? হতে পারে সেখানকার প্রযুক্তি বর্তমানের পৃথিবীর প্রযুক্তি থেকেও কয়েক হাজার বৎসর এগিয়ে।
তোর কথাগুলো পাগলের প্রলাপের মত শোনাচ্ছে, জসিম বলতে লাগল, আরে ঐখানে যাওয়া কি এতই সহজ, আর সেখান থেকে কারো ফিরে আসারও তো কোন প্রমান নেই।
এমনও তো হতে পারে সেখান থেকে কেউ ফিরে আসতে চায় না, হয়ত অবস্থাটাই এমন যে, সেখানে যা ইচ্ছে তাই পাওয়া যায় বা করা যায়, সবকিছু একেবারে মনের ইচ্ছাধীন আবদুল্লাহর জবাব।
হ্যা সেটা হওয়াও অসম্ভব না, জসিম বলল।
চল টিফিন শেষ, মাহাবুব সবাইকে তাড়া লাগাল। ছেলেরা সবাই ক্লাসরুমে চলে এল।
রাতে বাসায় নিজের জড়ার টেবিলের সামনে আবদুল্লাহ্ বসে আছে। মাথায় একটাই চিন্তা, প্যারালেল ওয়ার্ল্ড। কিভাবে সেখানে যাওয়া সম্ভব? প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে যাওয়ার প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি ওকে গ্রাস করল। অনেক ভেবে চিন্তে কিছু তথ্য ও একত্র করতে সক্ষম হল।
১। প্যারালেল ওয়ার্ল্ডের জন্য ত্রিভুজ আকৃতির একটি পরিবেশ প্রয়োজন যা কৃত্রিম ট্রায়াঙ্গলের মত কাজ করবে।
২। সবুজাভ স্বচ্ছ কাচ বেষ্ঠিত হলে উত্তম। সবুজাভ হওয়ার কারন হচ্ছে সবুজ প্রকৃতির প্রধান উপাদান বৃক্ষের নিদর্শন।
নাহ্, এটা কোন যুক্তিই হল না, নিজের কাছেই উদ্ভট লাগছে, আবদুল্লাহ ভাবল।
৩। চুম্বকীয় প্রভাব।
৪। মস্তিষ্কের নিউরন থেকে কার্বন, অক্সিজেন প্রভৃতি দ্বারা প্রচন্ড ইচ্ছাশক্তি বাহিরে প্রেরন করা, যা চুম্বকীয় প্রভাবের সাথে মিশে এক ধরনের মিশ্র প্রভাব সৃষ্টি করবে।
ব্যাস এতটুকু করে চেষ্টা করা যেতে পারে। উপরের প্রথম ও দ্বিতীয়টি একই সাথে করা সম্ভব। কাচের তৈরী ত্রিভুজ আকৃতির একটি ঘর তৈরী করে তার মধ্যে কৃত্রিম গ্রীন হাউজ তৈরী করলেই সবুজাভ পরিবেশ সৃষ্টি হবে। চুম্বকীয় প্রভাবের ব্যবস্থা করবেন ড. সালাম স্যার। উনি লারনার্স ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান। আর চতুর্থটিও সম্ভব। আবদুল্লাহ্ মেডিটেশনে নিয়মিত।
কাল সকালে ভোরে উঠে প্রথম ও দ্বিতীয়টির ব্যবস্থা করে ফেলতে হবে ইনশাআল্লাহ, আবদুল্লাহ্ ভাবল। স্টাডি, নামাজ ও রাতের খাবার খেয়ে ও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। ভোরে ফজর নামাজ পড়েই কম্পিউটারের সামনে বসে একটি গ্রীন হাউসের সর্বনিম্ন মাপ বের করল ‘ও’ ইন্টারনেট থেকে। এরপর ঐ মাপের চারভাগের একভাগ বের করে ‘ও’ কাচ কিনে আনাল। দারোয়ানদের একজনকে দিয়ে একজন রাজমিস্ত্রিকে ডেকে এনে মাপ বুঝিয়ে দিয়ে ত্রিভুজ আকৃতির একটি হাউজ তৈরী করাল। এবার গাছ সংগ্রহের পালা। ঘড়িতে তখন সকাল এগারোটা। গাছ আজ আর কেনা হবে না। ভার্সিটিতে ছুটল আবদুল্লাহ্।
ভার্সিটিতে এসেই প্রফেসর ড. সালাম স্যারের সাথে দেখা করল আবদুল্লাহ্। স্যার জানালেন চৌম্বকীয় প্রভাব সমৃদ্ধ যন্ত্র দুই দিনের মধ্যেই তৈরী করে দেয়া সম্ভব। সকল খরচ বহন করবে আবদুল্লাহ্।
পরের দুই দিন কাটল খুব ব্যস্ততায়। বিভিন্ন রকম গাছ গাছালি এনে কৃত্রিম ট্রায়াঙ্গলকে তৈরী করল গ্রীন হাউজে। তৃতীয় দিনের মাথায় চুম্বকীয় প্রভাব সম্বলিত তিনটি দন্ত এনে ট্রায়াঙ্গলের তিন কোনায় বসিয়ে দেয়া হল। দন্ড তিনটিই চুম্বকের তৈরী। তার উপর তামার তার দিয়ে কয়েলের মত পেচানো। সমস্ত দন্তটি আগাগোড়া ফেল্ট দিয়ে মোড়া, যাতে বিদ্যুৎ বাহিরে পরিবাহিত হতে না পারে। প্রতিটি দন্ড একটির সাথে অন্যটি আবরনী তার দিয়ে যুক্ত। আবদুল্লাহ্ সব আয়োজন করেছে তাদের বাড়ির পেছনে। দারোয়ানরা সবাই বেশ কৌতুহলী তবে আবদুল্লাহর কঠোর নিষেধ আছে বাড়ির পেছনে কেউই আসতে পারবে না টানা তিনদিন। দারোয়ান, ছোট বোন বা ভাবি কেউই না। ‘ও’ বলেছে কেউ এলেই ওর পরীক্ষার সমস্যা হবে। ভার্সিটি থেকে এক সপ্তাহের ছুটি নিল আবদুল্লাহ্।
দিনটি শুক্রবার। রাতের খাবার খেয়ে এবং নামাজ আদায় করে চলে এল গ্রীন হাউজে। চুম্বকীয় দন্ডগুলোতে বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়া হয়েছে। বাড়ীর পেছনের বৈদ্যুতিক বাতি থেকেই কিছু আলো এসে পড়েছে গ্রীন হা্উজে। একরকম আলো আধারীর মত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মেডিটেশনের জন্য উৎকৃষ্ট। আবদুল্লাহ্ পদ্মাশনে বসে পড়ল। এমনিতেই শরীর কেমন যেন ঝিরঝির করছে। মনে হয় চুম্বকীয় প্রভাবের ফল। কতক্ষন মেডেটেশনে ছিল বলতে পারবে না, হঠাৎই চোখে তীব্র আলোর উপস্থিতি অনুভব করল। তারপরেও চোখ খুলল না। হঠাৎ কাধ ধরে ঝাকুনি। এবার চোখ খুলতে হল। একটি প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে আছে আবদুল্লাহ্। এক উজ্জল আলো চারদিকে। বর্তমানের এনার্জি ল্যাম্পগুলো থেকেও কয়েকশত গুন উজ্জল কিন্তু দৃষ্টি সয়ে যাচ্ছে। প্ল্যাটফর্মটা এয়ারপোর্টের ইমাগ্রেশন সেন্টারের মত। আশপাশের মানুষজন সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। পুরুষরা সবাই স্যুট পরিহিত আর মহিলারা বোরখায় আবৃত। ওকে যে ঝাকাচ্ছিল তারও স্যুট পরিহিত কিন্তু দুই কাধে ব্যাজ লাগানো। বোজা গেল উনি সামরিক দায়িত্ব পালনে রত।
জনাব আপনার নাম? শুদ্ধ বাংলায় জিজ্ঞেস করল লোকটি।
আবদুল্লাহ্, মেহেদী আল আবদুল্লাহ্, নিজের নাম বলল ‘ও’।
প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে স্বাগতম। আপনি কোথায় যেতে চান? এখানে যে কেউ যেকোন সময় যেকোন স্থানে যেতে পারে, তার কোন ভাড়া বা কোন অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না একমাস পযর্ন্ত।
আবদুল্লাহ্ কিছুক্ষন ভাবল, সম্ভবত আমি এখন বাংলাদেশেই আছি, বর্তমানে সর্বাপেক্ষা উন্নত প্রযুক্তি হচ্ছে আমেরিকান প্রযুক্তি। তাই সেখানে যাওয়াই স্থির করল ‘ও’।
লোকটি নিজের নাম জানাল আবুল কাশেম। আবদুল্লাহকে প্রথমে একটি ওয়াশ রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হল। সেকানে কয়েকটি রোবট বসে গল্প করছিল। দেখতে হুবহু মানুষের মত। সকলেই পুরুষের বেশে। একধরনের সুগন্ধিযুক্ত পানি দিয়ে তারা আবদুল্লাহকে গোসল করিয়ে স্যুট পড়িয়ে দিল। এরপর আরেকটি রুমে ঢুকিয়ে দেয়া হল। এখানেও কয়েকটি রোবট। ‘ও’কে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে কাচ দিয়ে ঘীরে দেয়া হল। সম্পূর্ন রুম অন্ধকার করে দিয়ে এক ধরনের লেজার রশ্মি ছড়িয়ে দেয়া হল গোটা রুমময়। এ অবস্থা মিনিট পাচেক স্থায়ী হল। এরপর ’ও’কে আবার মি. আবুল কাশেমের হাতে হস্তান্তর করা হল।
এসব কি হল? আবদুল্লাহর জিজ্ঞাসা।
প্রথম রুমে আপনার সম্পূর্ন দেহ জীবানুমুক্ত করে জীবানুমুক্ত পোষাক পড়ানো হয়েছে। দ্বিতীয় রুমে লেজার রশ্মি দিয়ে আপনার দেহের সকল রোগ জীবানু ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আপনি এখন নিরোগ। প্যারালেল ওয়ার্ল্ড সব ধরনের ধুলোবালি ও রোগ জীবানু মুক্ত। মি. কাশেম আবদুল্লাহকে একটি যন্ত্রে বসিয়ে দিলেন। যেটি দেখতে অনেকটা মটর সাইকেলের মতই। বলা যায় একটি চেয়ারের সাথে মটর সাইকেলের সামনের অংশ জুড়ে দেয়া হয়েছে। কোন হ্যান্ডেল বা স্টীয়ারিং নেই। শুধু একিট স্ক্রীন দেয়া। যা দুটি অংশে বিভক্ত। একটি অংশে যানটির সকল তথ্যাদি দেখা যাচ্ছে, অন্য আরেকটি অংশে ম্যাপ। মি. কাশেম, আবদুল্লাহকে সব শিখিয়ে দিলেন।
আবদুল্লাহ স্ত্রিনের দিকে মুখ এনে বলল, ইউএসএ। সাথে সাথে আমেরিকার ম্যাপ চলে এল। এবার ও বলল ওয়াশিংটন ডিসি। বলতে বলতেই ও কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটি ঝাকি খেল। ব্যাস সামনে থেকে সবকিছু উধাও। ‘ও’ নিজেকে অন্য আরেকটি প্ল্যাটফর্মে আবিষ্কার করল। সাদা চামড়ার একজন পুলিশ এসে ওকে বলল, ওয়েলকাম টু ওয়াশিংটন ডিসি। দিস ইজ প্ল্যাটফর্ম ওয়ান ও ওয়ান। আই এম এন্ড্রু হল। নাইস টু মিট ইউ মি. আবদুল্লাহ্।
আবদুল্লাহ্ যে যন্ত্রটিতে বসে আসে সেখানে একটি অংশ থেকে ভয়েস কনভার্টার এক্টিভ হওয়ার কমান্ড দিল। হোস্ট ল্যাংগুয়েজ বাংলা আর গেস্ট ল্যাংগুয়েজ ইংরেজী। অর্থাৎ ‘ও’ বাংলা বলবে অন্যরা শুনবে ইংরেজীতে। পুলিশ কর্মিটি জানাল আবদুল্লাহ্ ইচ্ছে করলে যেকোন স্থানে ঘুরে দেখতে পারে একমাস পযর্ন্ত। খেতে বা থাকতে হলে যেকোন হোটেলে ঢুকে পড়লেই হল। ওর স্যুটে সব নিয়ন্ত্রনের মাধ্যম দেয়া আছে। শুধু কমান্ড দিলেই হল। ওর বাহনটির কোড হচ্ছে ‘আবদুল্লাহ্ বিডি ওয়ান হানড্রেড সিক্সটিন। ওর কোথাও যেতে ইচ্ছে করলে এই কোডটি বললেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে যানটি ওর সামনে চলে আসবে। ভয়েস কনভার্টার স্যুটের মধ্যেই দেয়া আছে।
প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে আবদুল্লাহর কাজ হচ্ছে আমেরিকার চিকিৎসা প্রযুক্তি দেখা প্রথমে। তারপর একে একে বাকীগুলো। তারপর পৃথিবীতে ফেরত আসা। এখানে থাকার কোনরূপ ইচ্ছেই নেই ওর। কেউ ফেরত না যাওয়ার কারনটি ও এখন বুঝতে পারছে। এখানে রোগ বলতে কোন শব্দই নেই। খাবার নিয়ে চিন্তা নেই। সবকিছু নিয়ন্ত্রন করে দেশের সরকার। সকলেই কোন না কোন গবেষনার কাজে জড়িত। আবদুল্লাহকে একমাস পর ওর পছন্দঅনুযায়ী এ রকম কোন একটি গবেষনাগারে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। সরকার সবার মৌলিক অধিকারগুলো বিনামূল্যে সরবরাহ করে। এই পৃথিবীতে নেই ভুমিকম্প বা কোন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগের প্রভাব। দিন রাত্রি এখানে সমান সমান। আবদুল্লাহ আমেরিকান একজনের সাথে কথা বলল। লোকটি জানাল যে, এই প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে কেউ ত্রিশ মিনিটের বেশী অবস্থান করলেই আর ফেরত যেতে পারে না। ফেরত যাওয়ার যদি পদ্ধতি থেকেও থাকে সেক্ষেত্রে সেটা আর কাজ করবে না। আবদুল্লাহ্ ঘড়ি দেখল। ‘ও’ এখানে এসেছে প্রায় আঠার মিনিট। লোকটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে কমান্ড দিয়ে ওর বাহনটি এনে চলে এল সেই প্ল্যাটফর্মে। যেটা বাংলাদেশে অবস্থিত। ‘ও’ বুঝে গেছে সমগ্র পৃথিবীর এখন চিকিৎসা পদ্ধতি বলতে একমাত্র লেজার রশ্মি। অন্য প্রযুক্তিগুলো দেখা সম্ভব না। সময় নেই। এই লেজার রম্মির তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে এর মধ্যকার উপাদান গুলি কি কি। পুনরায় মি. কাশেমের সাথে দেখা করল আর জানাল লেজার রশ্মিটির কথা ও পৃথিবীতে ফেরত যাওয়ার কথা। পৃথিবী থেকে একজন এসে আবার ফেরত যেতে চাইছে, এটা শুনে তিনি যারপরনাই অবাক হলেন। পৃথিবীতে যেতে চাইলে অত কিছু করতে হয় না, শুধু নিজের পরিহিত স্যুটের লাল বাটনটি চাপ দিলেই হল। ত্রিশ মিনিট পর এই বাটনটি আর কাজ করবে না। আবদুল্লাহ্ ঘড়ি দেখল। হাতে এখনও পাচ মিনিট বাকী আছে। ’ও’ আবারও লেজার রশ্মি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। ভদ্রলোক জানালেন এ রশ্মিটি প্রাকৃতিক উপাদান থেকে তৈরী। তা যথার্থ বলতে পারবে যারা এর গবেষনার কাজে জড়িত। আসলে এই পৃথিবীর সব প্রযুক্তিই প্রাকৃতিকে গবেষনা করে বের করা। প্রকৃতিই সব।
আর মাত্র দুই মিনিট সময় বাকী আছে। শেষ প্রশ্নটি করল আবদুল্লাহ্। আচ্ছা স্যার, আমার শরীর পৃথিবীতে গিয়েও কি নিরোগ থাকবে?
মি. কাশেম জানালেন, পৃথিবীতে যাওয়ার পর পৃথিবীর রোগজীবানু দ্বারা ’ও’ আবার আক্রান্ত হবে। মি. কাশেমকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে আবদুল্লাহ্ লাল বাটনে চাপ দিল। আবারও ঝিমঝিমানি এবং চিরচেনা পরিবেশ। ‘ও’ বসে আছে সেই গ্রীন হাউজটিতেই। খুব বেশিতো আর সময় কাটেনি। বড়জোড় চল্লিশ কি পঞ্চাশ মিনিট। আসলেই কি ও প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে গিয়েছিল নাকি সবটাই মেডিটেশনের ফল? কথা একটাই প্রকৃতিতেই রয়েছে সবকিছুর সমাধান। আবদুল্লাহ্ ওর রুমে চলে এল। ভাবল আর যাই হোক, ওর এই রিসার্চের কথা গোপন রাখতে হবে। তা না হলে পৃথিবীর সকলেই প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে যেতে চাইবে। অফুরন্ত সুখশান্তি কে না চায়? ওহ্ ভুল হয়ে গেছে, মি. কাশেমকে জিজ্ঞেস করা হয়নি প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে মৃত্যু আছে কিনা?
যাই হোক, কাল কলেজে যেতে হবে। এক সপ্তাহ ছুটি কাটানো হল না। আমিই বোধহয় প্রথম মানুষ যে প্যারালেল ওয়ার্ল্ডে গিয়েও ফিরে এলাম, ভাবতে ভাবতে বিছানায় পিঠ ঠেকাল আবদুল্লাহ্।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন সায়েন্স ফিকশন : প্যারালেল ওয়ার্ল্ড
সামুদ্রিক কল্পকাহিনী : ওটা কী ছিল?
ব্যক্তিগত জীবনে আমি লেখালেখিতে কখনই অভ্যস্ত ছিলাম না। বয়স তো কম হলো না। এ পযর্ন্ত জীবনে কোন কবিতা কিংবা ছোট গল্প লিখেছি কিনা মনে পড়ে না। তারপরেও লিখতে বসলাম কারন না লিখে যাওয়াটা অন্যায় মনে হচ্ছে বা হবে আমার জন্য। তবে ইদানিং লিখার চেষ্টা করছি। হয়তো ঘটনাটা অনেক রাঙিয়ে বর্ণনা করতে পারবো না, যেটা সাধারনত প্রফেশনাল লেখকদের প্রধান বৈশিষ্ট্য। তবে এতটুকু বলতে পারি যে, ঘটনাটি আপনাদের ভালো লাগবে। আমার জানা কোন তথ্যই বাদ পড়বে না এতে। তারমানে হচ্ছে এই যে, ব্যাপারটি সম্পর্কে আমি যতটুকু জানি ঠিক ততটুকুই জানাব আপনাদের।
যাক অনেক বলে ফেললাম। এখন আমার পরিচয় দেয়া যাক। ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন ব্যবসায়ী। দেশ থেকে বিদেশে বা বিদেশ থেকে দেশে আমার আমদানী-রপ্তানীর ব্যবসা রয়েছে। আমার বাড়ি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। তবে আমার জন্ম হয়েছে লস এঞ্জেলসে। হয়তে প্রশ্ন করতে পারেন মহাসাগরের এক তীর থেকে অন্য তীরে কেন এলাম? তাহলে বলে রাখি এক প্রকার ব্যবসা বা জীবন বাঁচানোর তাগিদেই ম্যানহাটনে আসা। আমার বাবা ছিলেন একজন কোস্টগার্ড। তাই অধিকাংশ সময়েই তিনি সমুদ্রে কাটাতেন। আমার রক্তেও তাই সমুদ্রের লোনা গন্ধ ঢুকে পড়েছিল। তবে জীবনের অর্ধেকটা সময় পযর্ন্ত সমুদ্রের দেখা তেমন পাইনি। আমার স্ত্রী নিউজিল্যান্ড-ভারতীয় বংশদ্ভূত। আমি লস এঞ্জেলসে আর ও নিউজিল্যান্ডের- যাক সে অন্য কাহিনী। আমার দুটো ছেলে একটি মেয়ে। ছেলে দুটো বড়, মেয়েটি ছোট।
বয়স তখন আনুমানিক পয়ত্রিশ। দেহে তখনও যৌবনের ভাটা পড়েনি। একবার এক বিকেলে বারান্দায় বসে পাইপ টানছিলাম আর রাস্তা দিয়ে লোকজনের আসা যাওয়া দেখছিলাম। এমন সময় আমার এক পুরোনো বন্ধুর আগমন ঘটল। আমরা এক সাথে স্কুলে পড়তাম।ওর বাবা আমার বাবার বন্ধু ছিল। তিনি ছিলেন একটি তিমি শিকারী জাহাজের নাবিক। আমার বন্ধুটি ওর বাবার পদাঙ্ক অনুসরন করেছে। প্রায় আট বৎসর পর ওর সাথে দেখা। বন্ধুকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
আমার যদি চোখ ঠিক থেকে থাকে তাহলে এ্যাডমন্ড তুই এখন আমার সামনে দাড়িয়ে আছিস, আমি বললাম।
তুই নির্ভূল বলেছিস, জোসেফ বুড়ো খোকা।
ওহ্, ভাবতেই পারিছিনা, এ্যাডমন্ড, আজ এই বিকেলে তুই, সেরা একজন নাবিক, যে কিনা নাওয়া খাওয়া ভূলে সারাক্ষন তিমি নামক উজবুক আর বিশাল মাছের পেছনে ধাওয়া করে, এখানে আমার সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছিস!
বিশ্বাস কর, জোসেফ, আমি এই তিমি শিকারী বুড়ো এ্যাডমন্ড, তোর সামনে বসে আছি, বিশ্বাস না হলে আমার চেয়ারটা লাথি মেরে একবার ফেলে দিয়ে দেখ।
পাঠক আমি আগেই বলেছি, এ্যাডমন্ড আমার বাল্যবন্ধু। তাই আমাদের মধ্যে এ রকম হেয়ালীপূর্ণ কথাবার্তা হর-হামেশাই হত। দুষ্টুমিতেও ছিলাম আমরা এলাকার সেরা। এক কথায় চরম ডানপিঠে।একদা দুজন মিলে একটি সওদাগরী জাহাজ ডুবিয়েই দিয়েছিলাম তার তলা ফাঁক করে দিয়ে। যাক অনেকদিন পর বন্ধুকে দেখে সেই হেয়ালীপূর্ণ ধরন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
তারপর কি মনে করে এই নিবোর্ধ বন্ধুর কাছে আজ তোর আগমন, আমি জিজ্ঞেস করলাম।
দেখ জোসেফ পলিন, তুই যদি তোর বাবা মি. গুস্তাভ পলিনের মত হয়ে থাকিস আর আমি যদি ভাবি এই ছুটিতে আমি আমার এক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেব তাহলে কি ভূল করেছি বলে তুই বলতে চাস?
ওহ্, আমি কি গর্দভ! তু্ই একদম ঠিক চিন্তাই করেছিস মহান নাবিক মি. পল এ্যাডমন্ডের যোগ্য পুত্র এ্যাডমন্ড হল।
নে নে হয়েছে এবার থামা, হাসতে হাসতে এ্যাডমন্ড বলল।
ঠিক আছে ঠিক আছে, তাহলে এখন বল তোর ওদিকটার খবর কি? আমি জানতে চাইলাম।
কোন দিকটা, পরিবার নাকি জাহাজের খবর?
তোর পরিবার? যতদূর জানি আঙ্কেল গত হয়েছেন তিন বৎসর আগে আর আন্ট জেনেলিনা এখন থাকেন লস এঞ্জেলসে, এছাড়া আর কেই বা আছে তোর পরিবারে, তোর মত হার্ড মাইন্ডেড লোকের কাছে কোন মেয়ে আসবে জীবন নিরামিষ করতে?
দারুন একটা উক্তি করেছিস দোস্ত, আমি এখনও বিয়ে করিনি, আর মা’ও গত হয়েছেন দুমাস হল, তোকে ব্যাপারটা জানাতে পারিনি বলে দু:খিত। তবে এখন ভাবছি বিয়ে করব, আমি ছাড়া তো কেউ নেই, বংশের ধারা তো রক্ষা করতে হবে, কি বলিস?
তা যা বলেছিস, আমি বললাম, তা কোন এলাকার মেয়ে তোর পছন্দের তালিকায় পড়ে?
গতকাল রাতে এখানকার এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে, হোটেলে, মেয়ের বাবা হোটেলে চাকুরি করে, হোটেলের খাবারে ভদ্রলোকের এ্যালার্জি হয় যার কারতে প্রতিদিন মেয়েটিই হোমমেইড খাবার দিয়ে যায় বাবাকে, একদমে কথাগুলো বলল এ্যাডমন্ড।
কোন হোটেল বলতো? এখানে মানে এই ম্যানহাটনে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আরে না, হোটেলটা নানটুকেটে। তুই তো জানিস ওটাই আমাদের স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত। তাহলে তো, আমি বললাম, কাল একবার নানটুকেট যেতে হয়।
পাঠক নানটুকেট হচ্ছে একটা দ্বীপ। যেটা ম্যাসাচুসেটস উপকূলের একটা দ্বীপ। এখানে এসেই নোঙ্গর করে সকল তিমি শিকারী জাহাজগুলো।
আমি এ্যাডমন্ডকে আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বাচ্চারা এমনিতেই এ্যাডমন্ডের নামের সাথে ও চরিত্রটির ব্যাপারে আগে থেকেই জানত। কারন আমি এ্যাডমন্ড ও আমার ছোটবেলার অনেক গল্প শুনিয়েছি তাদের। তাই এ্যাডমন্ডকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই ওরা হইচই করে উঠল এবং তখনই ঠিক হয়ে গেল এ্যাডমন্ড আজ রাতে বাচ্চাদের সাথে ঘুমুবে আর কাল ভোরে উঠে আমরা সবাই যাব নানটুকেট।
পরদিন বিকেল নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম নানটুকেট। এ্যাডমন্ড যে হোটেলটির কথা বলেছিল সেটি আসলে একটি সরাইখানা। আর তা শহরের প্রাণকেন্দ্রে। বলতে গেলে জেটি থেকে অনেক দূরেই। প্রথম দর্শনেই সরাইখানাটি আমার অপছন্দ হয়ে গেল। সরাইখানার প্রবেশমুখটি একটি গুহার আদলে তৈরী। শুরকি ও রং মিশিয়ে একেবারে গুহামুখের মতই করেছিল এককালে। কিন্তু এখন জায়গায় জায়গায় আস্তর খসে পড়েছে। দেখলে মনে হয় বহু প্রাচীন একটি গুহামুখ, আর তাতে অনেকদিন কেউ যাতায়াত করেনি। নামটিও গুহামুখের সাথে খাপ খাইয়ে রাখা হয়েছে “দ্য কেভ অব হ্যাভেন”। এ ধরনের একটি সরাইখানার মধ্যে “হ্যাভেন” পেল কোথায় তা আমি ভেবে পেলাম না। এক ‘হেভেন’ না বলে বলা উচিত ‘অড’। কত রকম মানুষের বাস এ পৃথিবীতে আর তাদের বুদ্ধিতেও ভিন্নতা আছে। আর মিল নেই তাদের রুচিতেও। যাই হোক আমরা “দ্য কেভ অব হ্যাভেন” নামক সরাইখানাটির ভেতরে প্রবেশ করলাম। আর সাথে সাথেই দেখতে পেলাম বাহিরের মতই সরাইখানার ভেতরেও গুহার আদলে তৈরী হয়েছে। ঠিক বুঝলাম না, সরাইমালিকের গুহা এত পছন্দ কেন?
রিসিপশনে একজন মহিলা বসা। গায়ের রং কালো, হোৎকা টাইপের দৈহিক গড়ন, কোকড়ানো চুলগুলো পেছন দিকে বেণী করা। বয়স মাঝারী ধরনের। চোখ দুটোতে উজ্জল দৃষ্টি ঠিকরে পড়ছে। দেখলেই বোঝা যায় এ মহিলা ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে এবং মাথায় অনেক বুদ্ধি ধরে। জানা গেল ইনি হচ্ছেন বারমেড। বারটেন্ডারের অনুপস্থিতিতে ইনি সরাইখানার দেখাশুনা করেন। বারটেন্ডার কি একটা কাজে বাইরে বেরিয়েছে, আসবে ঘন্টা দুয়েক পর। আমরা আজ রাতে থাকার জন্য দুটি কামরা রিজার্ভ করলাম। এ্যাডমন্ড যে মেয়েটির কথা বলেছিল সে এল আমরা পৌঁছার ঘন্টা তিনেক পর। অনেক কথা হল তার সাথে, তার বাবার সাথে। ভদ্রলোকের নাম মি. জোহান বাক্নার। চেহারা ও আচার ব্যবহার মোটামুটি ভালোই।। আমাদের সকলেরই পছন্দ হল। বাচ্চারা তো বলতে গেলে একেবারে মজে গেল। ভদ্রলোকের বাচন ভঙ্গিও চমৎকার। জানা গেল, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম মি. জোহানের। নিজের অবস্থাও ভালো ছিল। যুবক অবস্থায় তিমি শিকারী জাহাজের বাবুর্চি ছিলেন। ভালই আয় করেছিলেন। বছর বিশেক কাজ করার পর হাতে কিছু পয়সা জমে। আর তা দিয়ে একটুকরো জমি কিনে তাতে সবজি বাগান করেন মি. জোহান। সবজি বাগানের পরিচযা করত মিসেস. জোহান এবং এঞ্জেলা। কিন্তু বিধি বাম। একবার এক জলোচ্ছাসে সব ধ্বংস হয়ে যায়। মিসেস. জোহান মারা যান। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে মি. জোহাস পড়েন বিপাকে। তিনি চাকরি নেন এই সরাইখানায়। আর মেয়ের নিজের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাটা সমাপ্ত করে এখন একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষিকার কাজ করে। বাপ মেয়ের সংসারে এখন মোটামুটি আয় হচ্ছে ভালই। অচিরেই নিজেরা একটা সরাইখানা দেয়ার ধান্ধায় আছেন। যাক বোঝা গেল ভদ্রলোক ও তার মেয়ে একদম ফ্রী। এ্যাডমন্ড তো খুশিতে একদম গদগদ হয়ে আছে। সে একটু পরপর আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর ইশারা করে বলছে “কিরে কেমন বুঝলি?”- আমিও ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম “পরে বলব-একটু ধৈয্য ধর।“ অবশেষে এঞ্জেলা বিদায় নিল। আমরা জমায়েত হলাম আমাদের কামরায়। আমি ঠিক করেছি আমি আর সারাহ (আমার স্ত্রী) ঘুমাব এক রুমে আর বাচ্চারা ও এ্যাডমন্ড ঘুমাবে আরেক রুমে। তারপর আমি বললাম, এ্যাডমন্ড কেমন হল?
কি হল? এ্যাডমন্ডের বিস্ময়সূচক জিজ্ঞাসা।
না মানে কেমন দেখলি, কি বুঝলি?
কি বুঝলাম মানে? আরে বুঝবি আর দেখবি তো তুই আর ভাবি। তোদের নিয়ে এলামতো সে জন্যই।
আর বাচ্চারা, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন মনে হল তোমাদের নতুন আন্টিকে?
দারুন, চমৎকার, বাচ্চারা হইচই করে উঠল।
তাহলে তো হলই, আমি বললাম।
তাহলে তো হলই, মানে? তুই কি ফিট বলতে চাচ্ছিস, এ্যাডমন্ডের জিজ্ঞাসা।
আহা, এ্যাডমন্ড ব্রো, আপনি কি এখনও আমাদের মতামত বুঝতে পারেন নি, আপনি বরং মি. বাক্নার এর সাথে কথা বলুন বিয়ের দিনক্ষন ঠিক করার ব্যাপারে, তুমি কি বল? সারাহ সাপোর্টের আশায় আমার দিকে তাকাল।
তুমি ঠিকই বলেছ, হানি। আমিও ঠিক একই কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
তাহলে, এ্যাডমন্ড বলল, আমরা কাল দুপুর নাগাদ সব কথা পাকা করে ফেলছি, তারপর আর কি, হ্যা হ্যা।
হ্যা হ্যা আমিও ওর হাসির প্রত্যুত্তর দিলাম। আমাদের হাসি সংক্রামিত হল সকলের মুখে।
পরদিন দুপুরের দিকে এ্যাডমন্ড সব কিছু ঠিক ঠাক করে ফেলল। ঠিক হল আগামী সপ্তাহে রোববার স্টার সানডের বিশেষ দিনে বিয়ে হবে ম্যানহাটনে, আমাদের বাড়ীতে কাছের গির্জায়। আমরা সেদিনই ম্যানহাটনে ফিরলাম। নির্দিষ্ট সময়ই বিয়ে হয়ে গেল এ্যাডমন্ড আর এঞ্জেলার। ওদের হানিমুনও হল আমাদের বাড়িতেই। বিয়ের দু’সপ্তাহের মাথায় নানটুকেট থেকে খবর এল এ্যাডমন্ডকে সেখানে যেতে হবে, জরুরী তলব। ঐদিনই এ্যাডমন্ড নানটুকেট গেল। এঞ্জেলা রইল আমাদের কাছে। ঐ দিনটি এ্যাডমন্ড নানটুকেট থেকে গেল। পরদিন দুপুরের দিকে ফিরল ম্যানহাটনে।ও ফিরতেই ওর চোখমুখে উত্তেজনা লক্ষ্য করলাম। বুঝলাম শীঘ্রই সমুদ্রে ফিরবে ও। কেন আমার এ রকম ধারনা হল তা আজও আমি বলতে পারব না।
অনেকটা প্রাকৃতিক খেয়ালেই বা টেলিপ্যাথির জোড়েই হয়ত আমার এ রকম ধারনা হয়েছিল এবং ধারনা সত্যি হয়েছিল। কিছুটা সুস্থির হওয়ার পর সেদিন এ্যাডমন্ড আমার সাথে বারান্দায় এসে বসল।
তারপর, আমি বললাম, কেন গিয়েছিলি নানটুকেট?
আর বলিস না, এ্যাডমন্ড বলতে লাগল, ক্যাপ্টেন খবর দিয়েছিলেন। বাহক এসে বলল জাহাজে জরুরী ডাক পড়েছে, তা তো তুই শুনেছিস।
তা কি খবর, সব ঠিক আছে তো? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যা, সবকিছুই ঠিক আছে, তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার সমুদ্রে ফিরতে হবে, এ্যাডমন্ড বলল।
কেন, তুই তো ছুটি এনেছিলি, আমার জিজ্ঞাসা।
তা ঠিক, তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রপতির আদেশ তো ফেলনার নয়, কি বলিস? এ্যাডমন্ড টিটকারির সুরে বলল আমাকে।
কি বলতে চাস তুই, ঠিক ভাবে বলতো, আমি বিরক্ত হয়ে বললাম।
চরম একটা খবর বন্ধু, এ্যাডমন্ড বলতে শুরু করল, নানটুকেট গিয়ে দেখি আমাদের জাহাজটি জেটিতে নোঙর করে আছে। ক্যাপ্টেন স্যার ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে জাহাজের ডেকে বসে আছেন। তাকে ঘীরে দাড়িয়েছে আমাদের জাহাজের প্রায় সকল কর্মচারীগন। আমিও গেলাম। আমাদের জাহাজের থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল আমাকে একটা চেয়ার টেনে বসতে বললেন। ক্যাপ্টেন আমাকে স্বাগত জানালেন। আমিও তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম এবং প্রত্যেকের সাথে হ্যান্ডশেক করলাম।
সবাই কি এসে পড়েছে? ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন সহকারী ক্যাপ্টেন মি. জোহান সুইটকে।
না স্যার, একজন বাকি আছে, মি. বিলি মেন আসেন নি।
মি. বিলি মেন হচ্ছেন জাহাজের প্রধান চার হারপুনারদের মধ্যে একজন।
ঐ তো স্যার উনি এসে পড়েছেন, চিৎকার করে উঠল মি. সুইট।
হ্যা, এবার শুরু করা যাক, ক্যাপ্টেন বললেন অবশেষে। আমার কাছে চিঠিটি পৌঁছেছে গত চারদিন আগে। চিঠিটি পাঠিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী মি. বার্ক এন্ডারসন। চিঠিটি আপনাদের আমি সম্পূর্ণ পড়ে শোনাচ্ছি, এই বলে মি. কেট বন্ড, আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন, চিঠিটি পড়তে লাগলেন।
প্রিয় মি. কেট বন্ড, এই জেনে আমি গবির্ত যে, আপনার মত একজন ক্যাপ্টেন আছেন যিনি অসাধ্য সাধন করতে পারেন। আমি আপনার জাহাজ, আপনার নিজের এবং আপনার ক্রুদের প্রশংসা শুনেছি। আপনারা দেশের অর্থনীতির সামুদ্রিক খাতে যা দিয়েছেন তা আজ আর আমি বিস্তারিত বর্ণনা করতে চাইনা। আপনাদের জাহাজের মালিক মি. আরনল্ড হলম্যান এর কাছে অনেকবার প্রশংসা ও ধন্যবাদ পত্র পাঠিয়েছি। তিনিও তার জাহাজের সকল ক্রুদের প্রশংসা করেছেন। যাই হোক, আসল কথায় আসা যাক। আপনি হয়ত শুনে থাকবেন যে, গত দুই সপ্তাহ আগে আমাদের মহাকাশ টেলিস্কোপে নানটুকেটের অধূরে সাগরে একটি অদ্ভুত প্রানীর দেখা পাওয়া গেছে। প্রানীটি দেখতে নীল তিমির মত বড়। আমরা সকলেই জানি নীল তিমির লেজ হোমোসার্কাল অথচ সেই প্রানীটির লেজ হেটারোসার্কাল। প্রানীটির মুখ দেখতে ডলফিনের মত এবং সমস্ত দেহ আঁইশে আবৃত। প্রানীটি তিমির মত পানির ফোয়ারা সৃষ্টি করতে পারে। দেহে পাখনা আছে এবং তা দেখতে হুবহু হাঙরের মত। পিঠের দিকের রঙ ধূসর এবং পেট সাদা। প্রায় দুই মিনিটের জন্য প্রানীটি সারফেসে উঠেছিল যার ফলে টেলিস্কোপ এত কিছু সনাক্ত করতে পেরেছে। আশ্চযের ব্যাপার হচ্ছে ঐ দিনের পর একে আর কোথাও দেখা যায়নি। মি. বন্ড বুঝতেই পারছেন এ রকম অদ্ভুত প্রানীর ব্যাপারে দেশের বৈজ্ঞানিক নামের ইতিহাসে নতুন একটি নামের যোগ হবে। হবে গবেষনা। হয়ত এর থেকে প্রকাশ পাবে নতুন কোন বিবর্তনের তথ্য, হয়ত পাওয়া যাবে অমূল্য ঔষধ কে বলতে পারে সে কথা?
মি. বন্ড আমি আপনার সুনামের পরিপ্রেক্ষিতে এতটুকু অনুরোধ করতে পারি, আপনি যদি প্রানীটি ধরা বা খোঁজার ব্যাপারে আমাদের নেভিকে কোনরূপ সাহায্য করতে পারেন তাহলে কৃতার্থ হব। এর জন্য অবশ্য সরকার আপনাকে যথাযথ সম্মানিত করবে। যদি আপনি সম্মত হন তাহলে আগামী সাত দিনের মধ্যে আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করছি। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
এতটুকু পড়ে মি. বন্ড থামলেন। বললেন নীচে মি. বার্ক এন্ডারসনের সাইন ও সিল রয়েছে। এরপর তিনি আমাদের সকলের দিকে একবার করে চোখ বুলালেন্ এরপর জাহাজের ফার্স্টমেট মি. সলোমন করিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি বুঝলেন মি. করিম, এখন আমাদের কি করা উচিত?
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মি. সলোমন আমাদের জাহাজের সবচেয়ে সাহসী ব্যাক্তি, বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারেও তার কোন জুড়ি নেই। তিনি সাথে সাথে বললেন, মি. এন্ডারসনকে আপনার সম্মতি জানিয়ে দেয়া উচিৎ স্যার। ভদ্রলোক আপনার উপর ভরসা করে আছেন। কোন চিন্তা করবেন না, আমরা প্রানীটিকে খুজে বের করব ইনশাআল্লাহ, তবে ধরতে পারব কিনা তা বলতে পারছি না, কারন প্রানীটির গতিবিধি আমাদের কাছে অজানা এবং কতটুকু আক্রমনাত্মক সেটাও।
মি. করিম কোন কথাকে জোর দিয়ে বোঝানোর জন্য উপরোক্ত “ইনশাআল্লাহ” শব্দটি প্রয়োগ করেন এবং আমি দেখেছি উনি কোন কাজ করার আগে এই শব্দটি ব্যবহার করলে তিনি সেই কাজে সফলতা পান। এটা প্রমানিত, যার চাক্ষুস সাক্ষী আমি।
যাই হোক মি. বন্ড বললেন, একেবারে আমার মনের কথাগুলোই বলেছেন মি. করিম। আপনার সদিচ্ছার প্রশংসা করতেই হয়, আমার মনে হয় অন্য সকলেই আমাদের সাথে সম্মতি জ্ঞাপন করবেন, কি বলেন সবাই?
আমরা সবাই একে একে সম্মতি জানালাম তবে জাহাজের থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল বললেন, আমাদের আরও তথ্য নেয়া উচিত প্রানীটির ব্যাপারে, ঠিক কোথায় দেখা গেছে এবং একে জীবিত না মৃত অবস্থায় ধরতে হবে এসব ব্যাপার যা চিঠিতে উল্লেখ নেই। আপনি ঠিকই বলেছেন মি. সয়েল, আমার মনে হয় প্রানীটিকে জীবিত ধরতে বলা হবে, তবে কেন আমার এমন মনে হচ্ছে তা বলতে পারছি না, মি. বন্ড বললেন।
এরপর আরও কিছুক্ষন আলোচনার পর আমরা সবাই যে যার স্থানে ফিরে এলাম। আমাদের সবাইকে যেতে হবে আগামী সপ্তাহের সোমবারে। একেবারে প্রস্তুতি নিয়ে। এই হচ্ছে ঘটনা।
হু, শুনলাম, নিশ্চয়ই খুব এ্যাডভেঞ্চার হবে, তা তোদের জাহাজের সাথে নেভির কোন জাহাজ থাকবে নাকি? আমার জিজ্ঞাসা।
হ্যা, এ রকমই অনেকটা ইঙ্গিত রয়েছে চিঠিতে, তবে আমি শিওর না।
তোর কি মনে হয়, এ ধরনের প্রানী কি সত্যিই আছে নাকি? আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
থাকাটা অসম্ভবতো নয়ই, বরং সম্ভব। তার কারন এখন পযর্ন্ত হাজার হাজার প্রজাতির প্রানীর অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারে নি। তাছাড়া মিউটেশন, জিন-ডিএনএ-আরএনএ এ সবের দৈনন্দিন পরিবর্তনের ফলে জীব গঠনে যে রকম বৈচিত্র্য ঘটছে তাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়, এ্যাডমন্ড বলল।
হ্যা তোর কথায় যুক্তি রয়েছে, তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস, পরিবেশ দূষনের ফলে প্রানীদেহে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে, যার ফলে দেহে অনাকাঙ্খিত কোষের সংখ্যা বাড়ছে, এতে করে জীনের পরিবর্তন ঘটাটা অস্বাভাবিক নয়। মানুষের উচ্চতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, রোগ-রালাই প্রতিনিয়ত দেহের সঙ্গী হচ্ছে। জন্মগতভাবে অনেক শিশু প্রতিবন্ধি হয়ে জন্মগ্রহন করছে, আমার মনে হচ্ছে এগুলো সবই ঘটছে পরিবেশ দূষনের ফলে, তোর কি মত?
জোসেফ, আমি তোর সাথে একমত। আসলে এসব কিছুর জন্য মানব জাতিই দায়ী। যাকে বলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।
আচ্ছা বাদ দে এসব আলোচনা, আমি বললাম, বয়সতো অনেক হল, জীবনে এখন পযর্ন্ত তেমন কোন এ্যাডভেঞ্চার হল না, কোন আনন্দও এল না, সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিলাম শুধু ব্যবসার পেছনে। এখন আসল ব্যাপার হচ্ছে আমি তোর সঙ্গে জাহাজে যেতে চাই, নাবিকদের জীবন, সমুদ্রের প্রকৃতি আমি জানতে চাই।
কি বলছিস তুই, পাগল হয়ে গেছিস নাকি, তোর প্রানের চেয়েও প্রিয় ব্যবসা ছেড়ে তুই যেতে চাচ্ছিস এমন জীবনে যেখানে আছে আছে পযার্প্ত খাবার-না আছে কোন মেয়ে সঙ্গী, হ্যা তবে এটা ঠিক যে ওখানে আনন্দ আছে, সহকর্মীদের সাথে মজা করার যথেষ্ঠ সময় পাওয়া যায়, প্রায় একদমে কথাগুলো বলল এ্যাডমন্ড।
আমি বললাম, ব্যবসার কথা বলছিস, সে তো আমি একজনকে দায়িত্ব দিয়েই যাচ্ছি, আর সারা জীবন টাকার পেছনে ছোটার কোন অর্থ হয় না, জীবনটা উপভোগ্য, তাই শেষ জীবনটা আনন্দ ও এ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে কাটাতে চাই। আর তাছাড়া এটাও তো একটা অভিজ্ঞতা, তাই তো জানিস ছোটকাল থেকেই আমি অভিজ্ঞতার পেছনে ছুটেছি হন্যে হয়ে। বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি শুধুমাত্র ব্যবসার তাগিদে নয়, অভিজ্ঞতার তাগিদেও। ও হ্যা তোকে বলাই হয়নি, আমি একটি বই লিখছি আমার সকল অভিজ্ঞতা নিয়ে, ভাবছি তোর সাথে সমুদ্র ভ্রমন করে এসেই শেষ করব এর কাজ।
বই লিখছিস? এ্যাডমন্ডের দৃষ্টিতে কৌতুহল; ইন্টারেস্টিং তো, তা কি নাম তোর বইয়ের?
বইয়ের নাম হচ্ছে, আমি বললাম, “ওয়ার্ল্ড-আ হাউজ অফ এক্সপেরিয়েন্স।“
জটিল একটি নাম ঠিক করেছিস, একেবারে ইউনিক। নিশ্চয়ই তুই এর সিক্যুয়েল বের করবি?
ধীরে বন্ধু ধীরে, আমি বললাম, প্রথমটিই তো এখনও বের হল না, সিক্যুয়েল তো পরের কথা, হ্যা তবে এ রকমই ইচ্ছা আছে, পৃথিবীটাতো ক্ষুদ্র নয়। এসব কথা থাক এখন, বরং কাজের কথা বল, বল তুই আমাকে নিচ্ছিস কিনা?
তোকে না নিয়ে কি আর আমি পারি, তারপরও বলছি, তুই অনভিজ্ঞ আর তাছাড়া সমুদ্রে কত রকম দূর্ঘটনা ঘটে, এমনও দিন দেছে পেটে কিছু পড়েনি দিনরাত হাড়বাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়েছে, হাঙ্গরের মুখ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে, তিমির সাথে লড়াই, নৌকা উল্টানো, সব মিলিয়ে আমাদের জীবনের কোন সিকিউরিটি নেই। এখন তুই ঠিক কর যাবি কিনা?
আমি বুঝেছি বন্ধু, তারপরও আমি যেতে চাই, রক্তের টানেই যাব কারন বাবার রক্ততো আমার দেহে বইছে।
বুঝেছি বুঝেছি আর বলতে হবে না-তোকে আর কোনভাবেই আমি আটকাতে পারব না। ঠিক আছে তাহলে আগামী সোমবারের জন্য তৈরী থাক। কিছু জিনিস কিনতে হবে সেটা আমি লিখে দেব আর সবার আগে প্রয়োজন ভাবীর অনুমোদন, সেটা পাওয়া গেলে আমি মনে করি আর কোন বিপদ নেই।
আমি বললাম, আমার কথার উপর এই ঘরের কেউ কখনও কথা বলেনি, আশা করি এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না, তুই নিশ্চিত থাকতে পারিস, তোর ভাবি অনুমোদন দেবে। ঝামেলা হচ্ছে বাচ্চাদের নিয়ে। ওদেরও অবশ্য ম্যানেজ করতে পারব। সুতরাং এভরিথিং উইলবি ওকে।
আমরা এখন জাহাজে। গতকাল রোববার এ্যাডমন্ডের কথা মোতাবেক সকল জিনিসপত্র কিনেছি, যেমন : স্লিপিং ব্যাগ, রেসকিউ ব্যাগ, একটি ফার্স্ট এইড কিট বক্স সঙ্গে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, একটি রাবার ব্যাগ ইত্যাদি।
এরমধ্যে সবাই এসে পড়েছে। প্রথমেই আমরা দেখা করলাম জাহাজের ক্যাপ্টেন মি. কেট বন্ডের সাথে। ভদ্রলোকের অমায়িক ব্যবহার আমাকে অবাক করল। আমি শুনেছিলাম জাহাজের ক্যাপ্টেনরা তাদের কর্কষ ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত, আর এখানে দেখছি তার উল্টো।
এ্যাডমন্ড আমার কথা ওনাকে বলতেই উনি রাজি হয়ে গেলেন তবে প্রথমে আমাকে এ্যাডমন্ডের মত বিপদের কথা শোনালেন, যখন দেখলেন যে আমি অটল তখন আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, মি. পলিন আপনার মত একজন সাহসী লোককে জাহাজে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত, আমি নিশ্চিত আপনি অনেক সুনাম অর্জন করবেন।
আমি ওনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালাম।
এরপর আমি একে একে পরিচিত হলাম জাহাজের সকলের সাথে। এরা হলেন, সহকারী ক্যাপ্টেন মি. জোহান সুইট, ফার্স্টমেট মি. সলোমন করিম, সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন, থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল, ডাক্তার মি. হেনরি ক্লিমসন, আবহাওয়া বিশারদ মি. রবার্ট দ্যান, মৎস বিজ্ঞানী মি. এ্যালবার্ট বব, হারপুনার মি. বিলি মেন, মি. জি ওলমার্ট, মি. ব্রুক ফর্স, মি. সার্প, কামার মি. টম ব্যরন, মি. ডক ক্যালমিন, বাবুর্চি মি. টম হাসিল, বাবুর্চি সহকার মি. ব্রুস অর্চিন। এছাড়াও পাঁচজন নাবিক মি. ডন উইলিয়াম, মি. টমাস কেট, মি. উইল ডায়াজ, মি রোজার স্টোন ও মি. হুয়ান কিম। আরও রয়েছে বিশজন জাহাজী। সকলেই আমার সাথে বেশ আন্তরিক ব্যবহার করল। আমি, এ্যাডমন্ড, মি. হেনরি ক্লিমসন ও মি. এ্যালবার্ট বব পেলাম একটি কেবিন-শোয়া ও বিশ্রামের জন্য।
সোমবার রাতটা আমরা জাহাজেই থাকলাম কারন মঙ্গলবার আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রোববার অবশ্য থেকেছিলাম “দ্য কেভ অব হ্যাভেনে”। এঞ্জেলার বাবা মি. বাক্নার আমাদের যথেষ্ট আরামের সু ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার মধ্য সকালের দিকে আমরা জেটি থেকে জাহাজের নোঙর ছাড়ালাম। আমাদের জাহাজের কাঠামো অত্যন্ত নিরেট, ওক কাঠের তৈরী খোল এবং এজ ধরে বসানো হয়েছে মজবুত সংকর ধাতুর পাত। জাহাজের মাঝখানে অফিসার্স কোয়ার্টার। ডেকের সামনে একটি প্রকান্ড হোল তাতে চরবি, কলিজা ইত্যাদি রাখার বিভিন্ন খোপ। হোলটি ঢাকনা দ্বারা ঢাকা থাকে।জাহাজে বারটি হোয়েল বোট এবং পযার্প্ত পরিমানে রসদ রয়েছে। এ্যাফট বা জাহাজের পেছনদিকে রয়েছে রান্নাঘর, ফায়ারপ্লেস, স্তুপাকৃতি ব্যারেল ও গুদাম।
আমাদের জাহাজ চোদ্দ নট গতিতে চলতে সক্ষম। যথেষ্ট শক্তিশালী ইঞ্জিন।
দিনটি চমৎকার ছিল। জাহাজ জেটি ছেড়ে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। জেটিতে প্রায় পঁচিশটি জাহাজ নোঙর করা ছিল, ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল উদ্দম, দূর আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল অগনিত অ্যালবাট্রস ও আরও অনেক নাম না জানা মাছখেঁকো পাখি। সূযর্য়ের প্রতিবিম্ব পানিতে পড়েছিল-তাকাতেই চোখ ঝলসে দিতে চাইল।
অনেকদূরে ডলফিনের একটি দল চোখে পড়ল যারা সমুদ্রের নোনা পানিতে ঝাপাঝাপিতে মত্ত ছিল। আমাদের সামনে ও পেছনে ছিল মোট সাতটি জাহাজ। তন্মধ্যে পাঁচটি তিমি শিকারী, একটি নেভির ও একটি সওদাগরী জাহাজ ছিল।
আমাদের জাহাজের নামটিই এখনও বলা হয়নি। জাহাজের নাম ছিল “হোয়েল এক্সপ্রেস”।
পানি কেটে কেটে চলছে জাহাজ। আমি আর এ্যাডমন্ড ডেকে দাড়িয়ে আছি সঙ্গে ডাক্তার সাহেব। নানটুকেট জেটি ক্রমেই ছোট হতে হতে বিন্দুরূপে আমাদের চোখে ধরা দিচ্ছে।
দেখতে দেখতে দিনটি কেটে গেল। রাতে আমাদের কেবিনে জম্পেস আড্ডা হল। আমি শোনালাম আমার দেশ ভ্রমনের অভিজ্ঞতার কাহিনী, এ্যাডমন্ড শোনাল তার বিয়ের ঘটনা, ডাক্তার সাহেব জানালেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক চমকপ্রদ ঘটনা ও তথ্য, মৎস বিজ্ঞানী মি. বব জানালেন বিভিন্ন মাছের স্বভাব ও আত্মরক্ষার কৌশল, সাথে চলল শুকনো মাটন কাবাব ও ব্র্যান্ডি। আমি অবশ্য ব্র্যান্ডি নিলাম না, লেমোনেড দিয়ে চালিয়ে নিলাম ব্র্যান্ডির কাজ। ডাক্তার সাহেব বললেন, আরে খাও (উনি এতটাই মিশুক যে একদিনের মধ্যে উনি আমাকে ওনার ছোট ভাই বানিয়ে ফেলেছেন, আর তাই আমাকে তুমি করে সম্বোধন করেন) মাঝেমধ্যে এক আধটু ব্র্যান্ডি গলায় ঢালতে হয়-জানোতো এটা হার্টের জন্য বিশেষ উপকারী। আমরা সাধারনত হার্ট এ্যাটাক হলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে বা ট্যাবলেট জিহবার নীচে দেই কিন্তু ব্র্যান্ডি দিয়েও এই কাজ করা যায়। তিনি আরও জানালেন, জন্তুর তেল আমাদের হার্টের বারোটা বাজালেও মাছের তেল হার্টের উপকার করে।
আমি মি. ববকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা স্যার আসলে আমরা যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছি অর্থাৎ সেই মাছটি সম্পর্কে বিশদভাবে যদি কিছু বলতেন, এ্যাডমন্ডের মুখে ভাসাভাসা ভাবে আমি কিছু তথ্য শুনেছি এই যা, আপনি বুঝিয়ে বললে হয়ত বুঝতে পারব।
আপনাকে ধন্যবাদ(এটা মি. ববের একটা স্বভাব, কথা শুরু করার আগে বলেন, “ভালো”, আর কোন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেন “আপনাকে ধন্যবাদ”, ভদ্রলোকের দৈহিক উচ্চতা হবে পাঁচফুট সাত, দৈহিক গঠন স্বাভাবিক, মোটা লেন্সের চশমা চোখে, চুল ঝুলফির কাছে পাক ধরেছে, ভ্রু টেনে টেনে কথা বলেন, কথাবার্তা ও চালচলনে অভিজাত্য প্রকাশ পায়- অন্যদিকে ডাক্তার সাহেব যেন ঠিক তার উল্টো, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাঝারি সাইজের উস্কোখুস্কো চুল, অধিকাংশতেই পাক ধরেছে, কথায় নিখুত আমেরিকান টান, সবসময় হেসে হেসে কথা বলেন তবে কেউ ওনার কথা না শুনলে রাগে থরথর করে কাঁপেন, এটাও বোধহয় একধরনের সৌজন্যবোধ কারন এর কিছুক্ষন পরেই তিনি স্বাভাবিক হয়ে যান, চোখে মায়াবী চাহুনি, ভ্রু জোড়া পরস্পরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, চিকন করে ছাড়া গোফ, সামনের উপরের পাটির বামপাশের প্রি-মোলার দাত ভাঙ্গা, ঠিক ভাঙ্গা নয় বলতে গেলে ফাটা, এটারও অবশ্য একটা ঘটনা রয়েছে যা পরবর্তীতে শুনেছিলাম, সে কথায় পরে আসছি)
আসলে, মি. বব বলতে শরু করলেন, আমরাও এটা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না, শুধু কয়েক মিনিটের জন্য এর টেলিস্কোপিক ছবি দেখেছিলাম এবং এ থেকেই আমরা এর বৈশিষ্ট সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যৎবানী করেছিলাম। তা হচ্ছে প্রানীটি দেখতে নীল তিমির চেয়ে বড় বা ছোট হতে পারে তবে তা অবশ্যই একটি পূর্ন বয়স্ক নীল তিমির সমান। মাথাটি হুবহু ডলফিনের মত চোখা এবং মাথার উভয় পাশে হাঙ্গরের মত পাঁচটি করে ফুলকারন্ধ্র রয়েছে। লেজ হেটারোসার্কাল অর্থাৎ তারকার দু’মাথার মত না হয়ে গাছের শাখার মত লম্বা যেটা কিনা হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য। প্রানীটির সম্পূর্ণ দেহ আঁইশে আবৃত ,অথচ হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আঁইশ প্লাকয়েড। প্রানীটি তিমির মত পানির ফোয়ারা ছিটাতে পারে এবং দেহে হাঙ্গরের মত পাখনা রয়েছে। মাথাটা সম্পূর্ণ কালো, পিঠ ধূসর এবং পেট সাদা। এর লেজ কালো ও সাদার মিশ্রনে ডোরাকাটা অনেকটা জেব্রার মত। প্রানীটি সারফেসে উঠতে পছন্দ করে না কারন ঐ দিনের পর একে আর দেখা যায়নি-ঠিক কি কারনে ঔ দিন সে সারফেসে উঠেছিল সেটা আমাদের কাছে অজানা কারন আমরা টেলিস্কোপে তার দৈহিক অবস্থার কোন ধরনের ডিফিক্ট সনাক্ত করতে পারিনি। অর্থাৎ এর মূল গঠনটি হচ্ছে এ রকম-ডলফিনের মাথাটি এসে তিমির দেহের সাথে মিশেছে সাথে যোগ হয়েছে হাঙ্গরের ফুলকারন্ধ্র, সবশেষে যোগ হয়েছে হাঙ্গরের লেজ। আশ্চযের ব্যাপার কি জানেন, প্রানীটির দেহে পযার্প্ত পরিমান আঁইশ থাকলেও আমরা ফুলকারন্ধ্র সনাক্ত করতে পেরেছি। বলতে গেলে বলতে হয়, হাঙ্গর-তিমি-ডলফিন আর আঁইশওয়ালা মাছের সংকর এটি। আশ্চয্য বরই আশ্চযের ব্যাপার। আমার এত বছরের শিক্ষা, শিক্ষকতা ও গবেষনা জীবনে এমন প্রানীর কথা ভাবতেই পারিনি, এ যেন কল্পনা। জায়ান্ট, বিগ জায়ান্ট, অড জায়ান্ট, স্ট্রেঞ্জ জায়ান্ট এন্ড ওয়ান্ডারফুল জায়ান্ট। মি. ববের বক্তব্য শেষ হল।
সত্যিই আশ্চয এক প্রানী, ডাক্তারসাহেব মন্তব্য করলেন। আমিও ওনার সাথে মাথা নাড়ালাম।
স্যার, আমি আর এ্যাডমন্ড প্রানীটির বিবর্তনের ব্যাপারে কিছু আলোচনা করেছিলাম। আপনার এবং ডাক্তার সাহেবের আগ্রহ থাকলে আমি সেগুলো শোনাতে পারি। মি. বব এবং ডা. ক্লিমসন উভয়েই শোনতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
ও হ্যা, আরেকটি ব্যাপার পাঠকদের জানানো হয়নি, যদিও পাঠকরা হয়ত কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন তা হল, ডাক্তার মি. হেনরি ক্লিমসন এবং সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন ভাই। মি. হেনরি বড় আর মি. ডাবরি ছোট। মি. হেনরি এই জাহাজে ডাক্তার হিসেবে আছেন ত্রিশ বছর আর মি. ডাবরি জাহাজে আছেন বার বছর ধরে। মি. ডাবরি অবশ্য প্রথমে শিক্ষানুবিশ হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন, পরে থার্ড মেট এবং তারপর পদোন্নতি হয়ে সেকেন্ড মেট হয়েছেন। ভদ্রলোক বিয়ে করেছেন মাত্র তিনমাস হল। যাই হোক, আমি ওনাদের অর্থাৎ ডাক্তার সাহেব ও মি. ববকে আমার আর এ্যাডমন্ডের আলোচনা শোনালাম।
মি. বব বললেন, আমাদের ধারনার সাথে আপনাদের ধারনা প্রায় মিলে যাচ্ছে। তবে এটা ইউনিক প্রজাতী বা দুর্লভ প্রজাতীও হতে পারে কারন প্রতিনিয়তই বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন প্রানীর সন্ধান পাচ্ছেন যারা প্রাকৃতিক এবং কোন ধরনের সংকর প্রজাতি নয়। তারমানে হচ্ছে এই যে, প্রানীটি কোন সংকর প্রজাতি হতে পারে অথবা কোন বিবর্তনের ফলে অথবা নতুন প্রজাতি হতে পারে যা এখন পযর্ন্ত অনাবিষ্কৃত। আপনারা কি বলেন?
ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি যেভাবে কিং চেক দিয়েছেন তাতে আমার আর কি বলার আছে বলুন, কি বল জোসেফ?
নির্ভূল, আমি বললাম।
রাতের খাবারের পর একবার ক্যাপ্টেন মি. কেট বন্ডের সাথে দেখা করলাম। হাসিখুশি চেহারা, আধাপাকা দাড়ি গলা অবধি নেমে এসেছে, চুল প্রায় সব পেকে গেছে-তবে উনি কলপ ব্যবহার করেন, গোফ ছাটা, নিখুত আচড়ানো চুল, হাতে সবসময় দামি ঘরি পড়েন, আয়ত চোখ-শীতল দৃষ্টি, পাতলা ভ্রু, সব মিলিয়ে চেহারাতে কেমন যেন একটা গাম্ভীয্য চলে এসেছে, কথায় স্প্যানিশ টান (জন্মের ব্যাপারে ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি হেসে বলেন, ‘আমার জন্ম সমুদ্রের মাঝে, জাহাজে।‘ আর ভাষায় স্প্যানিশ টানের কথা জিজ্ঞেস করায় উনি বলেন, ‘আমি যৌবন পার করেছি স্পেনে।‘) ঢিলে ঢালা পোশাক পড়েন আর ভদ্রলোকের আন্তরিক ব্যবহারের কথাতো আগেই বলেছি। ওনার রুমে যেতেই উঠে দাড়িযে আন্তরিকবাবে হাত মেলালেন (ভদ্রলোক খাটে বসা ছিলেন-হাতের ডায়েরিতে কি সব আঁকিবুকি করছিলেন।)
তারপর মি. পলিন, কেমন কাটল আমাদের জাহাজে আজকের দিনটা? মি. বন্ড জিজ্ঞেস করলেন হাসিমুখে।
অসাধারন, আমি বললাম, আপনার ক্রুরা সকলেই বেশ আন্তরিক। সত্যি কথা বলতে কি, আমি জীবনে অনেক সামুদ্রিক কাহিনী সম্বলিত বই পড়েছি, অনেক নাবিক ক্যাপ্টেনের সাথে আমার পরিচয় আছে তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকের আচরনেই আমি আন্তরিকতা দেখেছি। অথচ এই জাহাজে এত ক্রু আর সকলেই আন্তরিক-ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ আশ্চয লাগছে।
মি. বন্ড আবার হাসলেন, বললেন, আসলে ঘটনা হচ্ছে, আমি সকলকে আনন্দের মধ্যে রাখি। যেমন, প্রতি মাসে একবার করে সকলে ভোজনসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালনের জন্য একত্র হয়, তখন জাহাজ নোঙর করা থাকে, আর যখন ডাঙ্গায় থাকি তখনতো যে যার ইচ্ছে মত আনন্দ করে। যার ফলে ক্রুরা সকলেই উজ্জীবীত থাকে, কাজে ফাঁকি দেয় না। মি. বন্ড এই বলে থামলেন তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, বয়স হয়েছে যার ফলে চাকুরি ছাড়ার জন্য আবেদন করেছিলাম, উদ্দেশ্য বাকী জীবনটা ছেলেমেয়ে নাতিনাতনীদের সাথে কাটাব। সারা জীবনে এ্যাডভেঞ্চার ও টাকা পয়সা তো আর কম আয় করলাম না। কিন্তু বোর্ড সরাসরি রিফিউজ করল। বলল, আপনার যতদিন চলার মত সমর্থ আছে ততদিন জাহাজে থাকবেন, প্রয়োজনে আপনার বেতন দ্বিগুন করা হবে, আর আপনি গেলে ক্রুরা সবাই চলে যাবে।
মি. বন্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, আমার জাহাজ ও ক্রুদের কৃতিত্বের কথা শুনে থাকবেন, বোর্ড ঠিকই বলেছে, আমি চলে গেলে ওরাও সবাই চলে যাবে, কেউ কেউ হয়ত এই পেশাই ছেড়ে দেবে, এসব ভেবে আর যেতে পারলাম না। অবশ্য আমার বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে তো আর ভাবিনা। যাক অনেক কথা বললাম। এখন আপনার কথা বলুন।
আমি হাসলাম, বললাম, আমি যদি আদৌ কোন বই বের করি আর তা যদি কোন গল্প হয় তাহলে সেই গল্পের নায়ক আপনি হবেন। সত্যিই স্যার, আপনার এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কোন তুলনা হয় না। বোর্ড যে আপনাকে ছেড়ে দেয়নি আমার মনে হয় তারা কোন ভুল করেনি, তা না হলে তারা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলত। অন্তত আমার যা ধারনা। যাই হোক অনেক রাত হল, আজ যাই স্যার, শুভরাত্রি।
মি. বন্ড বললেন, আপনার সাথে কথা বলে যারপরনাই ভালো লাগল, আপনি আবার আসবেন, আর কালতো আবার দেখা হচ্ছে, শুভরাত্রি।
আমি মি. বন্ডের রুম থেকে বেরিয়ে সোজা আমাদের কেবিনে চলে এলাম। দেখলাম ডা. সাহেব এবং এ্যাডমন্ড ইতোমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। রুমে অতি অল্প পাওয়ারের একটি বাল্ব জ্বলছে। সেটি না নিভিয়েই আমি শুয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙল নাবিকদের হৈ-হুল্লোড়ে। হাতমুখ ধুয়ে ডেক এ উঠে আসলাম। দেখলাম ডা. সাহেব, ক্যাপ্টেন এবং এ্যাডমন্ড রেলিং এর কাছে দাড়িয়ে কথা বলছে। আমি এগিয়ে গেলাম।
এসো এসো, তা ঘুম কেমন হল? ডা. সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
আমি সকলের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে বললাম, খুব ভাল বলব না কারন মানুষের ঘুম খুব ভালোর পযার্য়ে পড়ে না, হয়েছে মোটামুটি ভালই।
তোর লেখকী ভাষা এখানেও ব্যবহার করছিস, নাহ তোকে নিয়ে আর পারা গেল না, এ্যাডমন্ড বলল।
ওর কথায় ডাক্তার, ক্যাপ্টেন দু জনেই হেসে ফেললেন।
আচ্ছা, আমি জানতে চাইলাম, এত হৈ হুল্লোড়ের মানে কী?
ও জানোনা তাহলে, ডা. সাহেব বলতে লাগলেন, মি. উইল আজ ক্রোস নেস্ট থেকে একটি তিমি দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু আমরা পৌছানোর আগের সেটি হারিয়ে যায়, তবে এটা খুব ভালো লক্ষন। তিমি দেখার খবর শুনেই নাবিকরা চিল্লাচিল্লি শুরু করল।
পাঠক, মি. উইল ডায়াজ একজন নাবিক। তার কাজ হচ্ছে বাতাসের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা এবং ক্রোস নেস্টে বসে থেকে চারপাশে নজর রাখা।
আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আমি বললাম, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি বলবেন, কি করে আপনার সামনের দাতটি ফেটেছে? এ্যাডমন্ডের কাছে শুনেছিলাম এ ব্যাপারে নাকি একটি চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে।
আমাদের অবাক করে দিয়ে ডা. সাহেব এবং ক্যাপ্টেন একসঙ্গে হেসে উঠলেন। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
ডা. সাহেব অবশেষে বললেন, তাও ভালো যে এটা তুমি জিজ্ঞেস করেছ, অন্য কেউ এটা জিজ্ঞেস করার সাহসই পায় না। যাই হোক, ঘটনাটি একটু মজার আবার একটু বেদনাদায়কও বটে। ঘটনাটির একমাত্র প্রত্যাক্ষদর্শী হলেন আমাদের ক্যাপ্টেন সাহেব। এজন্যই দুজনে একসঙ্গে হেসে উঠলাম।
আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগের কথা, ডা. সাহেব বলতে আরম্ভ করলেন, এই জাহাজে উঠেছি তিন বৎসর হয়, তখন এখানকার মৎস বিজ্ঞানী ছিলেন মি. গিলবার্ট ফরেস্ট। ভদ্রলোক যেমনি সম্ভ্রান্ত ছিলেন তেমনি ছিলেন রাগী। তো প্রথম থেকেই আমার সাথে ওনার অনেক ব্যাপারেই মিলত না, কথা কাটাকাটি হত। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলছি না, ওসব ব্যাপারের কোনটাতেই আমার দোষ ছিল না, ভদ্রলোক এসেই কথার খোঁচা মারতেন আর আমিও সেটা সহ্য করতে পারতাম না। ব্যস শুরু হয়ে যেত বাকযুদ্ধ। এভাবে চলছিল, হঠাৎ একদিন হল কি…….।
দাড়ান দাড়ান, ক্যাপ্টেন ডা. সাহেব কে থামালেন, বাকিটা আমি বলি। মি. পলিন, ক্যাপ্টেন বললেন, একদিন ডাক্তার ও মি. ফরেস্ট ভোরবেলাতেই বাকযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তাদের তর্কের বিষয় ছিল তিমির দুধ গরুর বাচ্চাকে খাওয়ানো যাবে কিনা আর সেটা কতটুকু ফলপ্রসু হবে। মৎস বিজ্ঞানীর মত, খাওয়ানো যাবে না আর ডাক্তারের বললেন, খাওয়ালে ক্ষতি নেই। এভাবে চলছিল, একপযার্য়ে ঝগড়াটি হাতাহাতির রূপ নিল। আমি এসে বাধা দেয়ার আগেই দুজনেই পরস্পরের বিপরীতে ঘুসি বিনিময় করে ফেললেন এবং দুজনের টার্গেট নির্ভূল হয়েছিল। ডাক্তারের প্রি-মোলার দাত না ভেঙ্গে ফেটে গেল আর মি. ফরেস্টের সামনের নীচের একটি দাত ভেঙ্গে গেল। এই ঘটনার পর মি. ফরেস্ট চাকুরী ছেড়ে দিলেন, অবশ্য আমারও সে রকমই ইচ্ছে ছিল, কারন ডাক্তারতো ওনাকে পছন্দ করতেনই না, জাহাজের কোন ক্রুই তাকে পছন্দ করত না, আমি নিজেও না। এর প্রধান কারন সম্ভবত ভদ্রলোকের ঝগড়াটে মনোভাব। এই হচ্ছে ঘটনা। ক্যাপ্টেন থামলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, মি. ফরেস্ট এখন কি করছেন বা কোথায় আছেন?
যতটুকু শুনেছি, ক্যাপ্টেন বললেন, তিনি একটি তিমি শিকারী জাহাজে চাকুরী করেন, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে আমার বেশ ভালো জানাশোনা আছে। সেকানে ফরেস্ট সাহেব নাকি এই জাহাজের মতই পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। সেখানে ওনার প্রধান প্রতিপক্ষ জাহাজের আবহাওয়া বিশারদ। যার ফলে চাকুরী সেখানেও যাই যাই করছে। এ নিয়ে কত জায়গায় ওনার চাকুরী গেল তার ইয়ত্তা নেই। তবে লোকটি জ্ঞানী এবং নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বলে ক্যাপ্টেন আড়চোখে ডাক্তারের দিকে তাকালেন।
ডাক্তার সাহেব বললেন, সেটা আমিও অস্বীকার করিনা। ভদ্রলোক আসলেই জ্ঞানী, আমিও তর্কের মাধ্যমে অনেক তথ্য ওনার কাছ থেকে জেনেছি।
ওহহো, মনে পড়ার ভঙ্গিতে ক্যাপ্টেন বললেন, মি. পলিন, আপনি নাস্তা করেছেন?
আমি মৃদু হেসে বললাম, এইতো যাচ্ছি স্যার।
ডাক্তার সাহেব বললেন, চলো আমিও নাস্তা করিনি, দু জন একসাথে করি গিয়ে।
ক্যাপ্টেনকে বিদায় জানিয়ে আমরা কেবিনে ফিরে আসলাম।এ্যাডমন্ড সবে খাওয়া শুরু করেছে। আমাদের দুজনকে দেখে বলল, নাস্তা নিশ্চয়ই করা হয়নি, আজ রুটির সাথে সুস্বাদু ঝিনুকের স্টু ও পনির দিয়ে নাস্তা সাড়তে হবে।
আমি আর ডাক্তার সাহেব এ্যাডমন্ডের সাথে যোগ দিলাম। নাস্তা শেষ করেই আমরা তিনজন আবার ডেকে উঠে এলাম। ক্যাপ্টেন চলে গেছেন,তবে আবহাওয়া বিশারদ মি. রবার্ট দ্যানের সাথে দেখা হয়ে গেল। উনি অনেক দূরের ডলফিনের খেলা দেখছিলেন। ভদ্রলোকের চেহারা অনেক মোলায়েম, হাসিখুশি মুখ এবং জাহাজের অন্য সকল ক্রুদের মত তিনিও সদালাপী ও প্রাঞ্জল।
কত সুন্দর প্রকৃতি তাই না, হাস্যোজ্জল মুখে জিজ্ঞেস করলেন মি. দ্যান।
সত্যিই দারুন, মি. দ্যান, আমি উত্তর করলাম।
রৌদ্রোজ্জল চারপাশ, দু চারটা টুকরো টুকরো মেঘ আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, অ্যালবাট্রসের দল তাদের বিশাল বিশাল পাখা মেলে দিয়ে উড়ে চলছে, সূযের কিরন সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ে প্রতিফলন ঘটাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন হাজারো হাজারো হীরে সমগ্র সমুদ্র ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সত্যিই, এটাই একটা জগৎ, এটাই একটা পৃথিবী। যারা এই জগতে বাস করে তারা কতইনা সুখী, কতই না নিশ্চিন্ত।
আমরা চারজন নিজেদের পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছি এমনই সময় হাজির হলেন ত্রিরত্ন। অর্থাৎ ফার্স্ট মেট মি. সলোমন করিম, সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন, থার্ড মেট মি. ট্রিমিন সয়েল। ওনারা তিনজনেই আমাদের স্বাগত জানালেন। আমরাও প্রত্যুত্তর করলাম। আশ্চযের ব্যাপার হচ্ছে তিনজন মেট-ই টগবসে যুবক। কারও বয়স তিরিশের বেশি নয়।এত অল্প বয়সে এরূপ দক্ষতা আসলেই প্রশংসনীয়।
মি. সলোমন করিমের চুল বড়, মাথার পেছন দিকে চুল ঘাড় অবদি নেমে এসেছে, কালো রঙের সিল্কি চুল, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, লম্বা জুলফি, সবার্পেক্ষা আকর্ষনীয় হচ্ছে ওনার চোখ জোড়া। চোখজোড়ায় সাবর্ক্ষনীক যেন কোন বুদ্ধি ঝিলিক দিচ্ছে। দৈহিক গঠন মজবুত, পেটা শরীর, মনে হয় প্রতিদিন ব্যায়াম করেন।
মি. ডাবরি ক্লিমসন দেখতে হুবহু ভাইয়ের মত, শুধু বয়সটা একটু কম এই যা। তবে ওনার হিটলারি গোফ নজরে পরার মত।
থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল লম্বা, ছিপছিপে শরীর, শ্যামবর্ণ, সোনালী চুলের উচ্ছল যুবক। সবসময় ক্লিনশেভড। ওনার চোখের দিকে তাকালেও মনে হয় উনিও খুব বুদ্ধি ধরেন। তিনজনেরই বাচনভঙ্গি চমৎকার। তিনজনের সাথে খুব বেশি কথা বলার সময় পেলাম না। শুধু জানলাম শীঘ্রই সুখবর আসতে পারে। জাহাজের পেছনে চলে এলাম আমরা।
বাবুর্চি মি. টম হাসিলের মুখ লালচে আলুর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আগুনের কাছে থাকতে থাকতে মুখে লালচে আভা ধারন করেছে। তবে উনি ফর্সা। একটু বেটে এবং ভুড়িবহুল দেহ। উনি নড়ার সাথে সাথে ওনার ভুড়িটিও নড়ে ওঠে। মাথা ক্লিন শেভড, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। দাড়ির রং সোনালী। ছোটছোট চোখ। তবে ওনার মুচকি হাসি দেখতে চমৎকার লাগে। আমাদের চারজনের জন্য উনি চমৎকার কফি বানালেন। জানাগেল এগুলো ব্রাজিলিয়ান কফি। কথা বলতে বলতে কখনযে লাঞ্চের সময় হয়ে এল টেরই পেলাম না। লাঞ্চ করলাম চিংড়ী মাছ ভাজা, চিকেন স্যুপ এবং তিমি মাছের দুধ দিয়ে। তিমি মাছের দুধের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তিমিরা যখন সমুদ্র সারফেসে উঠে ফোয়ারা ছিটায় তখন বোটে করে জাহাজিরা গিয়ে দুধ নিয়ে আসে। এ এক অনন্য স্বাধ। না খেলে বোঝা যাবে না। লাঞ্চের সময় কেন জানি মনে হল আমাদের অভিযান শেষ হতে আর খুব দেরি নেই।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন। জাহাজী, নাবিক তথা ক্রুদের সাথে কথা বলে, আনন্দ ফুর্তি করে উপলব্দি হচ্ছে জীবনটা কতই না উপভোগ্য। একঘেয়েমিয়তা এখানে স্পর্শই করে না। চমৎকার আবহাওয়া, সুস্বাধু খাদ্য, চমৎকার বাসস্থান মোটকথা সবকিছু বিশুদ্ধ। একে একে কেটে গেল তিনটি মাস। টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছে এইতো সেদিন এলাম জাহাজে। এখন জাহাজে আমরা কাজ হচ্ছে লেখালেখি করা, ক্রুদের সাথে কথা বলা তাদের জবিনের গল্প ও অভিজ্ঞতার কথা শোনা, প্রকৃতি দেখা, রাতের আকাশের তারা পযবের্ক্ষন করা এবং ক্রুদের সাহায্য করা। এর মধ্যে প্রতিমাসে একবার জাহাজে জলসা হয়। সেটা হয় পূর্নিমার রাতে। জাহাজের ক্রুদের সবাই কিছু না কিছু করে দেখায়। একবারতো হারপুনার মি. জি. ওলমার্ট বাজি ধরে পরপর পাঁচ বোতল রাম সাবার করে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে নাবিকরা ট্রেজার আইল্যান্ডের সেই বিখ্যাত “মরা মানুষের সিন্দুক” গানটি গেয়ে ওঠে। এই তিনমাসের মধ্যে আমরা অনেক তিমি দেখেছি কিন্তু কোনটির পেছনেই দাওয়া করিনি।কারন আমাদের টার্গেট হচ্ছে “ট্রেঞ্জ ফিস”।
অবশেষে এল সেই দিন। প্রায় সাড়ে পাচ মাসের মাথায় মেঘাচ্ছন্ন একটি দিন। আমরা সবেমাত্র নাস্তা শেষ করেছি এমন সময়ই মি. উইল ডায়াজ ক্রোস নেস্ট থেকে চিৎকার করে উঠলেন। বলতে গেলে তার কন্ঠস্বর কেপে উঠল। জাহাজের সমস্ত ক্রু ডেকে জমা হল।
কি ব্যাপার?
দেখা গেছে, দেখা গেছে, দেখা……………….গে…………ছে, মি. ডায়াজ কোনমতে বলতে থাকলেন, স্যার স্ট্রেঞ্জ ফিস এই মুহূর্তে আমাদের সামনে। মনে হল কথাটি কানে ভুল শুনেছি। ক্যাপ্টেন তড়িঘরি করে ক্রোস নেস্টে উঠে গেলেন। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে রাখলেন পাক্কা পাঁচ মিনিট ছয় সেকেন্ড। অবশেষে নেমে জাহাজ এখানেই নোঙর করার নির্দেশ দিলেন। আমরাও খালি চোখে দেখতে পেলাম জগতের এযাবত কালের মধ্যে সবার্পেক্ষা অদ্ভুত জীবন্ত জীবটিকে। ক্যাপ্টেন স্যার সাথে সাথে ইউএস নেভির সাথে যোগাযোগ করলেন। তারা মাছটিকে জ্যান্ত ধরার চেষ্ঠা করতে বললেন।
ক্যাপ্টেন জানালেন, এটাকে জ্যান্ত ধরা এক কথায় অসম্ভব। সমস্ত দেহ আঁইশে আবৃত এবং প্রতিটি আঁইশে রয়েছে শতাধিক করে সুক্ষ সুক্ষ তীক্ষ্ণ কাঁটা। স্যাটেলাইটের তথ্যাবলীর সাথে বর্ননা হুবহু মিলে গেল। ইউএস নেভির কাছ থেকে প্রাণীটিকে মৃত ধরার নির্দেশ পাওয়া গেল। হারপুনাররা তাদের হারপুনে ধার দেয়ার তোরজোর শুরু করলেন। ক্যাপ্টেন তো প্রত্যেক হারপুনারের জন্য জনপ্রতি দশ হাজার ইউএস ডলার করে পুরস্কারের ঘোষনা দিলেন যদি কাজটি ঠিকমত সমাধা করতে পারে।
চারজন হারপুনার, ছয়জন জাহাজী, নাবিক মি. উইল ডায়াজ ও মি. হুয়ান কিম, থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েলসহ সবমিলিয়ে ষোলজন লোক চারটি বোটে করে “স্ট্রেঞ্জ ফিস” অভিমুখে যাত্রা করল। হারপুনাররা সদা সতর্ক। এগিয়ে থাকা প্রথম বোটে রয়েছে সবচেয়ে অভিজ্ঞ হারপুনার মি. বিলি মেন। সবাই তার নির্দেশের অপেক্ষা করছে। অবশেষে চারজন হারপুনার একসাথে তাদের অস্ত্র ছুড়লেন। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। চারজনের হারপুনই প্রানীটির মাথায় আঘাত করেছে। প্রথম তিনসেকেন্ড কিছুই ঘটল না। তারপর হঠাৎ করেই প্রানীটি সমুদ্র জলে ডুব মারল। হারপুনাররা তাদের হারপুনে কোন ধরনের টানই অনুভব করল না।
সেই যে গেল, গেলই। এই ঘটনার পর আরও ছয়মাস আমরা একে খুঁজে বেড়ালাম। কিন্তু বৃথা। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে আমরা ফিরে চললাম। জেটিতে আমার ছেলেমেয়েরা, তাদের মা, এ্যাডমন্ডের শ্বশুর ও স্ত্রী উপস্থিত ছিল। আমরা সবাই আমার বাড়িতে এসে উঠলাম। বাচ্চারাসহ বড়রা আমাদের দুজনকে ঝেকে ধরল সব শোনার জন্য। আমরাও ধৈয্য ধরে সব শোনালাম। ঘটনার পর আজ প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে একটি বারের জন্যও আর দেখা যায়নি স্ট্রেঞ্জ ফিসকে। এ্যাডমন্ড ফিরে গেছে সমুদ্রে। ওদের ঘরে এসেছে ফুটফুটে একটি ছেলে। হয়ত সেও বাবার মত তিমির পেছনে ধাওয়া করবে। স্ট্রেঞ্জ ফিসের দেহটি ছিল জেলি ফিসের মত থলথলে তাই হারপুনে কোন টান পড়েনি।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন সামুদ্রিক কল্পকাহিনী : ওটা কী ছিল?
যাক অনেক বলে ফেললাম। এখন আমার পরিচয় দেয়া যাক। ব্যক্তিগত জীবনে আমি একজন ব্যবসায়ী। দেশ থেকে বিদেশে বা বিদেশ থেকে দেশে আমার আমদানী-রপ্তানীর ব্যবসা রয়েছে। আমার বাড়ি নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে। তবে আমার জন্ম হয়েছে লস এঞ্জেলসে। হয়তে প্রশ্ন করতে পারেন মহাসাগরের এক তীর থেকে অন্য তীরে কেন এলাম? তাহলে বলে রাখি এক প্রকার ব্যবসা বা জীবন বাঁচানোর তাগিদেই ম্যানহাটনে আসা। আমার বাবা ছিলেন একজন কোস্টগার্ড। তাই অধিকাংশ সময়েই তিনি সমুদ্রে কাটাতেন। আমার রক্তেও তাই সমুদ্রের লোনা গন্ধ ঢুকে পড়েছিল। তবে জীবনের অর্ধেকটা সময় পযর্ন্ত সমুদ্রের দেখা তেমন পাইনি। আমার স্ত্রী নিউজিল্যান্ড-ভারতীয় বংশদ্ভূত। আমি লস এঞ্জেলসে আর ও নিউজিল্যান্ডের- যাক সে অন্য কাহিনী। আমার দুটো ছেলে একটি মেয়ে। ছেলে দুটো বড়, মেয়েটি ছোট।
বয়স তখন আনুমানিক পয়ত্রিশ। দেহে তখনও যৌবনের ভাটা পড়েনি। একবার এক বিকেলে বারান্দায় বসে পাইপ টানছিলাম আর রাস্তা দিয়ে লোকজনের আসা যাওয়া দেখছিলাম। এমন সময় আমার এক পুরোনো বন্ধুর আগমন ঘটল। আমরা এক সাথে স্কুলে পড়তাম।ওর বাবা আমার বাবার বন্ধু ছিল। তিনি ছিলেন একটি তিমি শিকারী জাহাজের নাবিক। আমার বন্ধুটি ওর বাবার পদাঙ্ক অনুসরন করেছে। প্রায় আট বৎসর পর ওর সাথে দেখা। বন্ধুকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
আমার যদি চোখ ঠিক থেকে থাকে তাহলে এ্যাডমন্ড তুই এখন আমার সামনে দাড়িয়ে আছিস, আমি বললাম।
তুই নির্ভূল বলেছিস, জোসেফ বুড়ো খোকা।
ওহ্, ভাবতেই পারিছিনা, এ্যাডমন্ড, আজ এই বিকেলে তুই, সেরা একজন নাবিক, যে কিনা নাওয়া খাওয়া ভূলে সারাক্ষন তিমি নামক উজবুক আর বিশাল মাছের পেছনে ধাওয়া করে, এখানে আমার সামনে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছিস!
বিশ্বাস কর, জোসেফ, আমি এই তিমি শিকারী বুড়ো এ্যাডমন্ড, তোর সামনে বসে আছি, বিশ্বাস না হলে আমার চেয়ারটা লাথি মেরে একবার ফেলে দিয়ে দেখ।
পাঠক আমি আগেই বলেছি, এ্যাডমন্ড আমার বাল্যবন্ধু। তাই আমাদের মধ্যে এ রকম হেয়ালীপূর্ণ কথাবার্তা হর-হামেশাই হত। দুষ্টুমিতেও ছিলাম আমরা এলাকার সেরা। এক কথায় চরম ডানপিঠে।একদা দুজন মিলে একটি সওদাগরী জাহাজ ডুবিয়েই দিয়েছিলাম তার তলা ফাঁক করে দিয়ে। যাক অনেকদিন পর বন্ধুকে দেখে সেই হেয়ালীপূর্ণ ধরন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
তারপর কি মনে করে এই নিবোর্ধ বন্ধুর কাছে আজ তোর আগমন, আমি জিজ্ঞেস করলাম।
দেখ জোসেফ পলিন, তুই যদি তোর বাবা মি. গুস্তাভ পলিনের মত হয়ে থাকিস আর আমি যদি ভাবি এই ছুটিতে আমি আমার এক বন্ধুর সাথে আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দেব তাহলে কি ভূল করেছি বলে তুই বলতে চাস?
ওহ্, আমি কি গর্দভ! তু্ই একদম ঠিক চিন্তাই করেছিস মহান নাবিক মি. পল এ্যাডমন্ডের যোগ্য পুত্র এ্যাডমন্ড হল।
নে নে হয়েছে এবার থামা, হাসতে হাসতে এ্যাডমন্ড বলল।
ঠিক আছে ঠিক আছে, তাহলে এখন বল তোর ওদিকটার খবর কি? আমি জানতে চাইলাম।
কোন দিকটা, পরিবার নাকি জাহাজের খবর?
তোর পরিবার? যতদূর জানি আঙ্কেল গত হয়েছেন তিন বৎসর আগে আর আন্ট জেনেলিনা এখন থাকেন লস এঞ্জেলসে, এছাড়া আর কেই বা আছে তোর পরিবারে, তোর মত হার্ড মাইন্ডেড লোকের কাছে কোন মেয়ে আসবে জীবন নিরামিষ করতে?
দারুন একটা উক্তি করেছিস দোস্ত, আমি এখনও বিয়ে করিনি, আর মা’ও গত হয়েছেন দুমাস হল, তোকে ব্যাপারটা জানাতে পারিনি বলে দু:খিত। তবে এখন ভাবছি বিয়ে করব, আমি ছাড়া তো কেউ নেই, বংশের ধারা তো রক্ষা করতে হবে, কি বলিস?
তা যা বলেছিস, আমি বললাম, তা কোন এলাকার মেয়ে তোর পছন্দের তালিকায় পড়ে?
গতকাল রাতে এখানকার এক মেয়ের সাথে পরিচয় হয়েছে, হোটেলে, মেয়ের বাবা হোটেলে চাকুরি করে, হোটেলের খাবারে ভদ্রলোকের এ্যালার্জি হয় যার কারতে প্রতিদিন মেয়েটিই হোমমেইড খাবার দিয়ে যায় বাবাকে, একদমে কথাগুলো বলল এ্যাডমন্ড।
কোন হোটেল বলতো? এখানে মানে এই ম্যানহাটনে? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
আরে না, হোটেলটা নানটুকেটে। তুই তো জানিস ওটাই আমাদের স্বর্গরাজ্য বলে পরিচিত। তাহলে তো, আমি বললাম, কাল একবার নানটুকেট যেতে হয়।
পাঠক নানটুকেট হচ্ছে একটা দ্বীপ। যেটা ম্যাসাচুসেটস উপকূলের একটা দ্বীপ। এখানে এসেই নোঙ্গর করে সকল তিমি শিকারী জাহাজগুলো।
আমি এ্যাডমন্ডকে আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বাচ্চারা এমনিতেই এ্যাডমন্ডের নামের সাথে ও চরিত্রটির ব্যাপারে আগে থেকেই জানত। কারন আমি এ্যাডমন্ড ও আমার ছোটবেলার অনেক গল্প শুনিয়েছি তাদের। তাই এ্যাডমন্ডকে ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেই ওরা হইচই করে উঠল এবং তখনই ঠিক হয়ে গেল এ্যাডমন্ড আজ রাতে বাচ্চাদের সাথে ঘুমুবে আর কাল ভোরে উঠে আমরা সবাই যাব নানটুকেট।
পরদিন বিকেল নাগাদ আমরা পৌছে গেলাম নানটুকেট। এ্যাডমন্ড যে হোটেলটির কথা বলেছিল সেটি আসলে একটি সরাইখানা। আর তা শহরের প্রাণকেন্দ্রে। বলতে গেলে জেটি থেকে অনেক দূরেই। প্রথম দর্শনেই সরাইখানাটি আমার অপছন্দ হয়ে গেল। সরাইখানার প্রবেশমুখটি একটি গুহার আদলে তৈরী। শুরকি ও রং মিশিয়ে একেবারে গুহামুখের মতই করেছিল এককালে। কিন্তু এখন জায়গায় জায়গায় আস্তর খসে পড়েছে। দেখলে মনে হয় বহু প্রাচীন একটি গুহামুখ, আর তাতে অনেকদিন কেউ যাতায়াত করেনি। নামটিও গুহামুখের সাথে খাপ খাইয়ে রাখা হয়েছে “দ্য কেভ অব হ্যাভেন”। এ ধরনের একটি সরাইখানার মধ্যে “হ্যাভেন” পেল কোথায় তা আমি ভেবে পেলাম না। এক ‘হেভেন’ না বলে বলা উচিত ‘অড’। কত রকম মানুষের বাস এ পৃথিবীতে আর তাদের বুদ্ধিতেও ভিন্নতা আছে। আর মিল নেই তাদের রুচিতেও। যাই হোক আমরা “দ্য কেভ অব হ্যাভেন” নামক সরাইখানাটির ভেতরে প্রবেশ করলাম। আর সাথে সাথেই দেখতে পেলাম বাহিরের মতই সরাইখানার ভেতরেও গুহার আদলে তৈরী হয়েছে। ঠিক বুঝলাম না, সরাইমালিকের গুহা এত পছন্দ কেন?
রিসিপশনে একজন মহিলা বসা। গায়ের রং কালো, হোৎকা টাইপের দৈহিক গড়ন, কোকড়ানো চুলগুলো পেছন দিকে বেণী করা। বয়স মাঝারী ধরনের। চোখ দুটোতে উজ্জল দৃষ্টি ঠিকরে পড়ছে। দেখলেই বোঝা যায় এ মহিলা ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে এবং মাথায় অনেক বুদ্ধি ধরে। জানা গেল ইনি হচ্ছেন বারমেড। বারটেন্ডারের অনুপস্থিতিতে ইনি সরাইখানার দেখাশুনা করেন। বারটেন্ডার কি একটা কাজে বাইরে বেরিয়েছে, আসবে ঘন্টা দুয়েক পর। আমরা আজ রাতে থাকার জন্য দুটি কামরা রিজার্ভ করলাম। এ্যাডমন্ড যে মেয়েটির কথা বলেছিল সে এল আমরা পৌঁছার ঘন্টা তিনেক পর। অনেক কথা হল তার সাথে, তার বাবার সাথে। ভদ্রলোকের নাম মি. জোহান বাক্নার। চেহারা ও আচার ব্যবহার মোটামুটি ভালোই।। আমাদের সকলেরই পছন্দ হল। বাচ্চারা তো বলতে গেলে একেবারে মজে গেল। ভদ্রলোকের বাচন ভঙ্গিও চমৎকার। জানা গেল, এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম মি. জোহানের। নিজের অবস্থাও ভালো ছিল। যুবক অবস্থায় তিমি শিকারী জাহাজের বাবুর্চি ছিলেন। ভালই আয় করেছিলেন। বছর বিশেক কাজ করার পর হাতে কিছু পয়সা জমে। আর তা দিয়ে একটুকরো জমি কিনে তাতে সবজি বাগান করেন মি. জোহান। সবজি বাগানের পরিচযা করত মিসেস. জোহান এবং এঞ্জেলা। কিন্তু বিধি বাম। একবার এক জলোচ্ছাসে সব ধ্বংস হয়ে যায়। মিসেস. জোহান মারা যান। একমাত্র মেয়েকে নিয়ে মি. জোহাস পড়েন বিপাকে। তিনি চাকরি নেন এই সরাইখানায়। আর মেয়ের নিজের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাটা সমাপ্ত করে এখন একটা প্রাইভেট স্কুলে শিক্ষিকার কাজ করে। বাপ মেয়ের সংসারে এখন মোটামুটি আয় হচ্ছে ভালই। অচিরেই নিজেরা একটা সরাইখানা দেয়ার ধান্ধায় আছেন। যাক বোঝা গেল ভদ্রলোক ও তার মেয়ে একদম ফ্রী। এ্যাডমন্ড তো খুশিতে একদম গদগদ হয়ে আছে। সে একটু পরপর আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে আর ইশারা করে বলছে “কিরে কেমন বুঝলি?”- আমিও ইশারায় বুঝিয়ে দিলাম “পরে বলব-একটু ধৈয্য ধর।“ অবশেষে এঞ্জেলা বিদায় নিল। আমরা জমায়েত হলাম আমাদের কামরায়। আমি ঠিক করেছি আমি আর সারাহ (আমার স্ত্রী) ঘুমাব এক রুমে আর বাচ্চারা ও এ্যাডমন্ড ঘুমাবে আরেক রুমে। তারপর আমি বললাম, এ্যাডমন্ড কেমন হল?
কি হল? এ্যাডমন্ডের বিস্ময়সূচক জিজ্ঞাসা।
না মানে কেমন দেখলি, কি বুঝলি?
কি বুঝলাম মানে? আরে বুঝবি আর দেখবি তো তুই আর ভাবি। তোদের নিয়ে এলামতো সে জন্যই।
আর বাচ্চারা, আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন মনে হল তোমাদের নতুন আন্টিকে?
দারুন, চমৎকার, বাচ্চারা হইচই করে উঠল।
তাহলে তো হলই, আমি বললাম।
তাহলে তো হলই, মানে? তুই কি ফিট বলতে চাচ্ছিস, এ্যাডমন্ডের জিজ্ঞাসা।
আহা, এ্যাডমন্ড ব্রো, আপনি কি এখনও আমাদের মতামত বুঝতে পারেন নি, আপনি বরং মি. বাক্নার এর সাথে কথা বলুন বিয়ের দিনক্ষন ঠিক করার ব্যাপারে, তুমি কি বল? সারাহ সাপোর্টের আশায় আমার দিকে তাকাল।
তুমি ঠিকই বলেছ, হানি। আমিও ঠিক একই কথা বলতে চাচ্ছিলাম।
তাহলে, এ্যাডমন্ড বলল, আমরা কাল দুপুর নাগাদ সব কথা পাকা করে ফেলছি, তারপর আর কি, হ্যা হ্যা।
হ্যা হ্যা আমিও ওর হাসির প্রত্যুত্তর দিলাম। আমাদের হাসি সংক্রামিত হল সকলের মুখে।
পরদিন দুপুরের দিকে এ্যাডমন্ড সব কিছু ঠিক ঠাক করে ফেলল। ঠিক হল আগামী সপ্তাহে রোববার স্টার সানডের বিশেষ দিনে বিয়ে হবে ম্যানহাটনে, আমাদের বাড়ীতে কাছের গির্জায়। আমরা সেদিনই ম্যানহাটনে ফিরলাম। নির্দিষ্ট সময়ই বিয়ে হয়ে গেল এ্যাডমন্ড আর এঞ্জেলার। ওদের হানিমুনও হল আমাদের বাড়িতেই। বিয়ের দু’সপ্তাহের মাথায় নানটুকেট থেকে খবর এল এ্যাডমন্ডকে সেখানে যেতে হবে, জরুরী তলব। ঐদিনই এ্যাডমন্ড নানটুকেট গেল। এঞ্জেলা রইল আমাদের কাছে। ঐ দিনটি এ্যাডমন্ড নানটুকেট থেকে গেল। পরদিন দুপুরের দিকে ফিরল ম্যানহাটনে।ও ফিরতেই ওর চোখমুখে উত্তেজনা লক্ষ্য করলাম। বুঝলাম শীঘ্রই সমুদ্রে ফিরবে ও। কেন আমার এ রকম ধারনা হল তা আজও আমি বলতে পারব না।
অনেকটা প্রাকৃতিক খেয়ালেই বা টেলিপ্যাথির জোড়েই হয়ত আমার এ রকম ধারনা হয়েছিল এবং ধারনা সত্যি হয়েছিল। কিছুটা সুস্থির হওয়ার পর সেদিন এ্যাডমন্ড আমার সাথে বারান্দায় এসে বসল।
তারপর, আমি বললাম, কেন গিয়েছিলি নানটুকেট?
আর বলিস না, এ্যাডমন্ড বলতে লাগল, ক্যাপ্টেন খবর দিয়েছিলেন। বাহক এসে বলল জাহাজে জরুরী ডাক পড়েছে, তা তো তুই শুনেছিস।
তা কি খবর, সব ঠিক আছে তো? আমি জিজ্ঞেস করলাম।
হ্যা, সবকিছুই ঠিক আছে, তবে এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার সমুদ্রে ফিরতে হবে, এ্যাডমন্ড বলল।
কেন, তুই তো ছুটি এনেছিলি, আমার জিজ্ঞাসা।
তা ঠিক, তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী এমনকি রাষ্ট্রপতির আদেশ তো ফেলনার নয়, কি বলিস? এ্যাডমন্ড টিটকারির সুরে বলল আমাকে।
কি বলতে চাস তুই, ঠিক ভাবে বলতো, আমি বিরক্ত হয়ে বললাম।
চরম একটা খবর বন্ধু, এ্যাডমন্ড বলতে শুরু করল, নানটুকেট গিয়ে দেখি আমাদের জাহাজটি জেটিতে নোঙর করে আছে। ক্যাপ্টেন স্যার ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে জাহাজের ডেকে বসে আছেন। তাকে ঘীরে দাড়িয়েছে আমাদের জাহাজের প্রায় সকল কর্মচারীগন। আমিও গেলাম। আমাদের জাহাজের থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল আমাকে একটা চেয়ার টেনে বসতে বললেন। ক্যাপ্টেন আমাকে স্বাগত জানালেন। আমিও তার সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করলাম এবং প্রত্যেকের সাথে হ্যান্ডশেক করলাম।
সবাই কি এসে পড়েছে? ক্যাপ্টেন জিজ্ঞেস করলেন সহকারী ক্যাপ্টেন মি. জোহান সুইটকে।
না স্যার, একজন বাকি আছে, মি. বিলি মেন আসেন নি।
মি. বিলি মেন হচ্ছেন জাহাজের প্রধান চার হারপুনারদের মধ্যে একজন।
ঐ তো স্যার উনি এসে পড়েছেন, চিৎকার করে উঠল মি. সুইট।
হ্যা, এবার শুরু করা যাক, ক্যাপ্টেন বললেন অবশেষে। আমার কাছে চিঠিটি পৌঁছেছে গত চারদিন আগে। চিঠিটি পাঠিয়েছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী মি. বার্ক এন্ডারসন। চিঠিটি আপনাদের আমি সম্পূর্ণ পড়ে শোনাচ্ছি, এই বলে মি. কেট বন্ড, আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন, চিঠিটি পড়তে লাগলেন।
প্রিয় মি. কেট বন্ড, এই জেনে আমি গবির্ত যে, আপনার মত একজন ক্যাপ্টেন আছেন যিনি অসাধ্য সাধন করতে পারেন। আমি আপনার জাহাজ, আপনার নিজের এবং আপনার ক্রুদের প্রশংসা শুনেছি। আপনারা দেশের অর্থনীতির সামুদ্রিক খাতে যা দিয়েছেন তা আজ আর আমি বিস্তারিত বর্ণনা করতে চাইনা। আপনাদের জাহাজের মালিক মি. আরনল্ড হলম্যান এর কাছে অনেকবার প্রশংসা ও ধন্যবাদ পত্র পাঠিয়েছি। তিনিও তার জাহাজের সকল ক্রুদের প্রশংসা করেছেন। যাই হোক, আসল কথায় আসা যাক। আপনি হয়ত শুনে থাকবেন যে, গত দুই সপ্তাহ আগে আমাদের মহাকাশ টেলিস্কোপে নানটুকেটের অধূরে সাগরে একটি অদ্ভুত প্রানীর দেখা পাওয়া গেছে। প্রানীটি দেখতে নীল তিমির মত বড়। আমরা সকলেই জানি নীল তিমির লেজ হোমোসার্কাল অথচ সেই প্রানীটির লেজ হেটারোসার্কাল। প্রানীটির মুখ দেখতে ডলফিনের মত এবং সমস্ত দেহ আঁইশে আবৃত। প্রানীটি তিমির মত পানির ফোয়ারা সৃষ্টি করতে পারে। দেহে পাখনা আছে এবং তা দেখতে হুবহু হাঙরের মত। পিঠের দিকের রঙ ধূসর এবং পেট সাদা। প্রায় দুই মিনিটের জন্য প্রানীটি সারফেসে উঠেছিল যার ফলে টেলিস্কোপ এত কিছু সনাক্ত করতে পেরেছে। আশ্চযের ব্যাপার হচ্ছে ঐ দিনের পর একে আর কোথাও দেখা যায়নি। মি. বন্ড বুঝতেই পারছেন এ রকম অদ্ভুত প্রানীর ব্যাপারে দেশের বৈজ্ঞানিক নামের ইতিহাসে নতুন একটি নামের যোগ হবে। হবে গবেষনা। হয়ত এর থেকে প্রকাশ পাবে নতুন কোন বিবর্তনের তথ্য, হয়ত পাওয়া যাবে অমূল্য ঔষধ কে বলতে পারে সে কথা?
মি. বন্ড আমি আপনার সুনামের পরিপ্রেক্ষিতে এতটুকু অনুরোধ করতে পারি, আপনি যদি প্রানীটি ধরা বা খোঁজার ব্যাপারে আমাদের নেভিকে কোনরূপ সাহায্য করতে পারেন তাহলে কৃতার্থ হব। এর জন্য অবশ্য সরকার আপনাকে যথাযথ সম্মানিত করবে। যদি আপনি সম্মত হন তাহলে আগামী সাত দিনের মধ্যে আমার সাথে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করছি। আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
এতটুকু পড়ে মি. বন্ড থামলেন। বললেন নীচে মি. বার্ক এন্ডারসনের সাইন ও সিল রয়েছে। এরপর তিনি আমাদের সকলের দিকে একবার করে চোখ বুলালেন্ এরপর জাহাজের ফার্স্টমেট মি. সলোমন করিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, কি বুঝলেন মি. করিম, এখন আমাদের কি করা উচিত?
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মি. সলোমন আমাদের জাহাজের সবচেয়ে সাহসী ব্যাক্তি, বুদ্ধিমত্তার ব্যাপারেও তার কোন জুড়ি নেই। তিনি সাথে সাথে বললেন, মি. এন্ডারসনকে আপনার সম্মতি জানিয়ে দেয়া উচিৎ স্যার। ভদ্রলোক আপনার উপর ভরসা করে আছেন। কোন চিন্তা করবেন না, আমরা প্রানীটিকে খুজে বের করব ইনশাআল্লাহ, তবে ধরতে পারব কিনা তা বলতে পারছি না, কারন প্রানীটির গতিবিধি আমাদের কাছে অজানা এবং কতটুকু আক্রমনাত্মক সেটাও।
মি. করিম কোন কথাকে জোর দিয়ে বোঝানোর জন্য উপরোক্ত “ইনশাআল্লাহ” শব্দটি প্রয়োগ করেন এবং আমি দেখেছি উনি কোন কাজ করার আগে এই শব্দটি ব্যবহার করলে তিনি সেই কাজে সফলতা পান। এটা প্রমানিত, যার চাক্ষুস সাক্ষী আমি।
যাই হোক মি. বন্ড বললেন, একেবারে আমার মনের কথাগুলোই বলেছেন মি. করিম। আপনার সদিচ্ছার প্রশংসা করতেই হয়, আমার মনে হয় অন্য সকলেই আমাদের সাথে সম্মতি জ্ঞাপন করবেন, কি বলেন সবাই?
আমরা সবাই একে একে সম্মতি জানালাম তবে জাহাজের থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল বললেন, আমাদের আরও তথ্য নেয়া উচিত প্রানীটির ব্যাপারে, ঠিক কোথায় দেখা গেছে এবং একে জীবিত না মৃত অবস্থায় ধরতে হবে এসব ব্যাপার যা চিঠিতে উল্লেখ নেই। আপনি ঠিকই বলেছেন মি. সয়েল, আমার মনে হয় প্রানীটিকে জীবিত ধরতে বলা হবে, তবে কেন আমার এমন মনে হচ্ছে তা বলতে পারছি না, মি. বন্ড বললেন।
এরপর আরও কিছুক্ষন আলোচনার পর আমরা সবাই যে যার স্থানে ফিরে এলাম। আমাদের সবাইকে যেতে হবে আগামী সপ্তাহের সোমবারে। একেবারে প্রস্তুতি নিয়ে। এই হচ্ছে ঘটনা।
হু, শুনলাম, নিশ্চয়ই খুব এ্যাডভেঞ্চার হবে, তা তোদের জাহাজের সাথে নেভির কোন জাহাজ থাকবে নাকি? আমার জিজ্ঞাসা।
হ্যা, এ রকমই অনেকটা ইঙ্গিত রয়েছে চিঠিতে, তবে আমি শিওর না।
তোর কি মনে হয়, এ ধরনের প্রানী কি সত্যিই আছে নাকি? আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম।
থাকাটা অসম্ভবতো নয়ই, বরং সম্ভব। তার কারন এখন পযর্ন্ত হাজার হাজার প্রজাতির প্রানীর অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারে নি। তাছাড়া মিউটেশন, জিন-ডিএনএ-আরএনএ এ সবের দৈনন্দিন পরিবর্তনের ফলে জীব গঠনে যে রকম বৈচিত্র্য ঘটছে তাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়, এ্যাডমন্ড বলল।
হ্যা তোর কথায় যুক্তি রয়েছে, তবে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস, পরিবেশ দূষনের ফলে প্রানীদেহে নানা ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে, যার ফলে দেহে অনাকাঙ্খিত কোষের সংখ্যা বাড়ছে, এতে করে জীনের পরিবর্তন ঘটাটা অস্বাভাবিক নয়। মানুষের উচ্চতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, রোগ-রালাই প্রতিনিয়ত দেহের সঙ্গী হচ্ছে। জন্মগতভাবে অনেক শিশু প্রতিবন্ধি হয়ে জন্মগ্রহন করছে, আমার মনে হচ্ছে এগুলো সবই ঘটছে পরিবেশ দূষনের ফলে, তোর কি মত?
জোসেফ, আমি তোর সাথে একমত। আসলে এসব কিছুর জন্য মানব জাতিই দায়ী। যাকে বলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।
আচ্ছা বাদ দে এসব আলোচনা, আমি বললাম, বয়সতো অনেক হল, জীবনে এখন পযর্ন্ত তেমন কোন এ্যাডভেঞ্চার হল না, কোন আনন্দও এল না, সমস্ত জীবন কাটিয়ে দিলাম শুধু ব্যবসার পেছনে। এখন আসল ব্যাপার হচ্ছে আমি তোর সঙ্গে জাহাজে যেতে চাই, নাবিকদের জীবন, সমুদ্রের প্রকৃতি আমি জানতে চাই।
কি বলছিস তুই, পাগল হয়ে গেছিস নাকি, তোর প্রানের চেয়েও প্রিয় ব্যবসা ছেড়ে তুই যেতে চাচ্ছিস এমন জীবনে যেখানে আছে আছে পযার্প্ত খাবার-না আছে কোন মেয়ে সঙ্গী, হ্যা তবে এটা ঠিক যে ওখানে আনন্দ আছে, সহকর্মীদের সাথে মজা করার যথেষ্ঠ সময় পাওয়া যায়, প্রায় একদমে কথাগুলো বলল এ্যাডমন্ড।
আমি বললাম, ব্যবসার কথা বলছিস, সে তো আমি একজনকে দায়িত্ব দিয়েই যাচ্ছি, আর সারা জীবন টাকার পেছনে ছোটার কোন অর্থ হয় না, জীবনটা উপভোগ্য, তাই শেষ জীবনটা আনন্দ ও এ্যাডভেঞ্চারের মধ্যে কাটাতে চাই। আর তাছাড়া এটাও তো একটা অভিজ্ঞতা, তাই তো জানিস ছোটকাল থেকেই আমি অভিজ্ঞতার পেছনে ছুটেছি হন্যে হয়ে। বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি শুধুমাত্র ব্যবসার তাগিদে নয়, অভিজ্ঞতার তাগিদেও। ও হ্যা তোকে বলাই হয়নি, আমি একটি বই লিখছি আমার সকল অভিজ্ঞতা নিয়ে, ভাবছি তোর সাথে সমুদ্র ভ্রমন করে এসেই শেষ করব এর কাজ।
বই লিখছিস? এ্যাডমন্ডের দৃষ্টিতে কৌতুহল; ইন্টারেস্টিং তো, তা কি নাম তোর বইয়ের?
বইয়ের নাম হচ্ছে, আমি বললাম, “ওয়ার্ল্ড-আ হাউজ অফ এক্সপেরিয়েন্স।“
জটিল একটি নাম ঠিক করেছিস, একেবারে ইউনিক। নিশ্চয়ই তুই এর সিক্যুয়েল বের করবি?
ধীরে বন্ধু ধীরে, আমি বললাম, প্রথমটিই তো এখনও বের হল না, সিক্যুয়েল তো পরের কথা, হ্যা তবে এ রকমই ইচ্ছা আছে, পৃথিবীটাতো ক্ষুদ্র নয়। এসব কথা থাক এখন, বরং কাজের কথা বল, বল তুই আমাকে নিচ্ছিস কিনা?
তোকে না নিয়ে কি আর আমি পারি, তারপরও বলছি, তুই অনভিজ্ঞ আর তাছাড়া সমুদ্রে কত রকম দূর্ঘটনা ঘটে, এমনও দিন দেছে পেটে কিছু পড়েনি দিনরাত হাড়বাঙ্গা পরিশ্রম করতে হয়েছে, হাঙ্গরের মুখ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে, তিমির সাথে লড়াই, নৌকা উল্টানো, সব মিলিয়ে আমাদের জীবনের কোন সিকিউরিটি নেই। এখন তুই ঠিক কর যাবি কিনা?
আমি বুঝেছি বন্ধু, তারপরও আমি যেতে চাই, রক্তের টানেই যাব কারন বাবার রক্ততো আমার দেহে বইছে।
বুঝেছি বুঝেছি আর বলতে হবে না-তোকে আর কোনভাবেই আমি আটকাতে পারব না। ঠিক আছে তাহলে আগামী সোমবারের জন্য তৈরী থাক। কিছু জিনিস কিনতে হবে সেটা আমি লিখে দেব আর সবার আগে প্রয়োজন ভাবীর অনুমোদন, সেটা পাওয়া গেলে আমি মনে করি আর কোন বিপদ নেই।
আমি বললাম, আমার কথার উপর এই ঘরের কেউ কখনও কথা বলেনি, আশা করি এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না, তুই নিশ্চিত থাকতে পারিস, তোর ভাবি অনুমোদন দেবে। ঝামেলা হচ্ছে বাচ্চাদের নিয়ে। ওদেরও অবশ্য ম্যানেজ করতে পারব। সুতরাং এভরিথিং উইলবি ওকে।
আমরা এখন জাহাজে। গতকাল রোববার এ্যাডমন্ডের কথা মোতাবেক সকল জিনিসপত্র কিনেছি, যেমন : স্লিপিং ব্যাগ, রেসকিউ ব্যাগ, একটি ফার্স্ট এইড কিট বক্স সঙ্গে প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, একটি রাবার ব্যাগ ইত্যাদি।
এরমধ্যে সবাই এসে পড়েছে। প্রথমেই আমরা দেখা করলাম জাহাজের ক্যাপ্টেন মি. কেট বন্ডের সাথে। ভদ্রলোকের অমায়িক ব্যবহার আমাকে অবাক করল। আমি শুনেছিলাম জাহাজের ক্যাপ্টেনরা তাদের কর্কষ ব্যবহারের জন্য বিখ্যাত, আর এখানে দেখছি তার উল্টো।
এ্যাডমন্ড আমার কথা ওনাকে বলতেই উনি রাজি হয়ে গেলেন তবে প্রথমে আমাকে এ্যাডমন্ডের মত বিপদের কথা শোনালেন, যখন দেখলেন যে আমি অটল তখন আমার পিঠ চাপড়ে বললেন, মি. পলিন আপনার মত একজন সাহসী লোককে জাহাজে পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত, আমি নিশ্চিত আপনি অনেক সুনাম অর্জন করবেন।
আমি ওনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানালাম।
এরপর আমি একে একে পরিচিত হলাম জাহাজের সকলের সাথে। এরা হলেন, সহকারী ক্যাপ্টেন মি. জোহান সুইট, ফার্স্টমেট মি. সলোমন করিম, সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন, থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল, ডাক্তার মি. হেনরি ক্লিমসন, আবহাওয়া বিশারদ মি. রবার্ট দ্যান, মৎস বিজ্ঞানী মি. এ্যালবার্ট বব, হারপুনার মি. বিলি মেন, মি. জি ওলমার্ট, মি. ব্রুক ফর্স, মি. সার্প, কামার মি. টম ব্যরন, মি. ডক ক্যালমিন, বাবুর্চি মি. টম হাসিল, বাবুর্চি সহকার মি. ব্রুস অর্চিন। এছাড়াও পাঁচজন নাবিক মি. ডন উইলিয়াম, মি. টমাস কেট, মি. উইল ডায়াজ, মি রোজার স্টোন ও মি. হুয়ান কিম। আরও রয়েছে বিশজন জাহাজী। সকলেই আমার সাথে বেশ আন্তরিক ব্যবহার করল। আমি, এ্যাডমন্ড, মি. হেনরি ক্লিমসন ও মি. এ্যালবার্ট বব পেলাম একটি কেবিন-শোয়া ও বিশ্রামের জন্য।
সোমবার রাতটা আমরা জাহাজেই থাকলাম কারন মঙ্গলবার আমাদের যাত্রা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। রোববার অবশ্য থেকেছিলাম “দ্য কেভ অব হ্যাভেনে”। এঞ্জেলার বাবা মি. বাক্নার আমাদের যথেষ্ট আরামের সু ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার মধ্য সকালের দিকে আমরা জেটি থেকে জাহাজের নোঙর ছাড়ালাম। আমাদের জাহাজের কাঠামো অত্যন্ত নিরেট, ওক কাঠের তৈরী খোল এবং এজ ধরে বসানো হয়েছে মজবুত সংকর ধাতুর পাত। জাহাজের মাঝখানে অফিসার্স কোয়ার্টার। ডেকের সামনে একটি প্রকান্ড হোল তাতে চরবি, কলিজা ইত্যাদি রাখার বিভিন্ন খোপ। হোলটি ঢাকনা দ্বারা ঢাকা থাকে।জাহাজে বারটি হোয়েল বোট এবং পযার্প্ত পরিমানে রসদ রয়েছে। এ্যাফট বা জাহাজের পেছনদিকে রয়েছে রান্নাঘর, ফায়ারপ্লেস, স্তুপাকৃতি ব্যারেল ও গুদাম।
আমাদের জাহাজ চোদ্দ নট গতিতে চলতে সক্ষম। যথেষ্ট শক্তিশালী ইঞ্জিন।
দিনটি চমৎকার ছিল। জাহাজ জেটি ছেড়ে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে। জেটিতে প্রায় পঁচিশটি জাহাজ নোঙর করা ছিল, ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দে প্রকৃতি হয়ে উঠেছিল উদ্দম, দূর আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছিল অগনিত অ্যালবাট্রস ও আরও অনেক নাম না জানা মাছখেঁকো পাখি। সূযর্য়ের প্রতিবিম্ব পানিতে পড়েছিল-তাকাতেই চোখ ঝলসে দিতে চাইল।
অনেকদূরে ডলফিনের একটি দল চোখে পড়ল যারা সমুদ্রের নোনা পানিতে ঝাপাঝাপিতে মত্ত ছিল। আমাদের সামনে ও পেছনে ছিল মোট সাতটি জাহাজ। তন্মধ্যে পাঁচটি তিমি শিকারী, একটি নেভির ও একটি সওদাগরী জাহাজ ছিল।
আমাদের জাহাজের নামটিই এখনও বলা হয়নি। জাহাজের নাম ছিল “হোয়েল এক্সপ্রেস”।
পানি কেটে কেটে চলছে জাহাজ। আমি আর এ্যাডমন্ড ডেকে দাড়িয়ে আছি সঙ্গে ডাক্তার সাহেব। নানটুকেট জেটি ক্রমেই ছোট হতে হতে বিন্দুরূপে আমাদের চোখে ধরা দিচ্ছে।
দেখতে দেখতে দিনটি কেটে গেল। রাতে আমাদের কেবিনে জম্পেস আড্ডা হল। আমি শোনালাম আমার দেশ ভ্রমনের অভিজ্ঞতার কাহিনী, এ্যাডমন্ড শোনাল তার বিয়ের ঘটনা, ডাক্তার সাহেব জানালেন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অনেক চমকপ্রদ ঘটনা ও তথ্য, মৎস বিজ্ঞানী মি. বব জানালেন বিভিন্ন মাছের স্বভাব ও আত্মরক্ষার কৌশল, সাথে চলল শুকনো মাটন কাবাব ও ব্র্যান্ডি। আমি অবশ্য ব্র্যান্ডি নিলাম না, লেমোনেড দিয়ে চালিয়ে নিলাম ব্র্যান্ডির কাজ। ডাক্তার সাহেব বললেন, আরে খাও (উনি এতটাই মিশুক যে একদিনের মধ্যে উনি আমাকে ওনার ছোট ভাই বানিয়ে ফেলেছেন, আর তাই আমাকে তুমি করে সম্বোধন করেন) মাঝেমধ্যে এক আধটু ব্র্যান্ডি গলায় ঢালতে হয়-জানোতো এটা হার্টের জন্য বিশেষ উপকারী। আমরা সাধারনত হার্ট এ্যাটাক হলে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসাবে নাইট্রোগ্লিসারিন স্প্রে বা ট্যাবলেট জিহবার নীচে দেই কিন্তু ব্র্যান্ডি দিয়েও এই কাজ করা যায়। তিনি আরও জানালেন, জন্তুর তেল আমাদের হার্টের বারোটা বাজালেও মাছের তেল হার্টের উপকার করে।
আমি মি. ববকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা স্যার আসলে আমরা যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছি অর্থাৎ সেই মাছটি সম্পর্কে বিশদভাবে যদি কিছু বলতেন, এ্যাডমন্ডের মুখে ভাসাভাসা ভাবে আমি কিছু তথ্য শুনেছি এই যা, আপনি বুঝিয়ে বললে হয়ত বুঝতে পারব।
আপনাকে ধন্যবাদ(এটা মি. ববের একটা স্বভাব, কথা শুরু করার আগে বলেন, “ভালো”, আর কোন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেন “আপনাকে ধন্যবাদ”, ভদ্রলোকের দৈহিক উচ্চতা হবে পাঁচফুট সাত, দৈহিক গঠন স্বাভাবিক, মোটা লেন্সের চশমা চোখে, চুল ঝুলফির কাছে পাক ধরেছে, ভ্রু টেনে টেনে কথা বলেন, কথাবার্তা ও চালচলনে অভিজাত্য প্রকাশ পায়- অন্যদিকে ডাক্তার সাহেব যেন ঠিক তার উল্টো, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাঝারি সাইজের উস্কোখুস্কো চুল, অধিকাংশতেই পাক ধরেছে, কথায় নিখুত আমেরিকান টান, সবসময় হেসে হেসে কথা বলেন তবে কেউ ওনার কথা না শুনলে রাগে থরথর করে কাঁপেন, এটাও বোধহয় একধরনের সৌজন্যবোধ কারন এর কিছুক্ষন পরেই তিনি স্বাভাবিক হয়ে যান, চোখে মায়াবী চাহুনি, ভ্রু জোড়া পরস্পরের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, চিকন করে ছাড়া গোফ, সামনের উপরের পাটির বামপাশের প্রি-মোলার দাত ভাঙ্গা, ঠিক ভাঙ্গা নয় বলতে গেলে ফাটা, এটারও অবশ্য একটা ঘটনা রয়েছে যা পরবর্তীতে শুনেছিলাম, সে কথায় পরে আসছি)
আসলে, মি. বব বলতে শরু করলেন, আমরাও এটা সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না, শুধু কয়েক মিনিটের জন্য এর টেলিস্কোপিক ছবি দেখেছিলাম এবং এ থেকেই আমরা এর বৈশিষ্ট সম্পর্কে কিছু ভবিষ্যৎবানী করেছিলাম। তা হচ্ছে প্রানীটি দেখতে নীল তিমির চেয়ে বড় বা ছোট হতে পারে তবে তা অবশ্যই একটি পূর্ন বয়স্ক নীল তিমির সমান। মাথাটি হুবহু ডলফিনের মত চোখা এবং মাথার উভয় পাশে হাঙ্গরের মত পাঁচটি করে ফুলকারন্ধ্র রয়েছে। লেজ হেটারোসার্কাল অর্থাৎ তারকার দু’মাথার মত না হয়ে গাছের শাখার মত লম্বা যেটা কিনা হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য। প্রানীটির সম্পূর্ণ দেহ আঁইশে আবৃত ,অথচ হাঙ্গরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আঁইশ প্লাকয়েড। প্রানীটি তিমির মত পানির ফোয়ারা ছিটাতে পারে এবং দেহে হাঙ্গরের মত পাখনা রয়েছে। মাথাটা সম্পূর্ণ কালো, পিঠ ধূসর এবং পেট সাদা। এর লেজ কালো ও সাদার মিশ্রনে ডোরাকাটা অনেকটা জেব্রার মত। প্রানীটি সারফেসে উঠতে পছন্দ করে না কারন ঐ দিনের পর একে আর দেখা যায়নি-ঠিক কি কারনে ঔ দিন সে সারফেসে উঠেছিল সেটা আমাদের কাছে অজানা কারন আমরা টেলিস্কোপে তার দৈহিক অবস্থার কোন ধরনের ডিফিক্ট সনাক্ত করতে পারিনি। অর্থাৎ এর মূল গঠনটি হচ্ছে এ রকম-ডলফিনের মাথাটি এসে তিমির দেহের সাথে মিশেছে সাথে যোগ হয়েছে হাঙ্গরের ফুলকারন্ধ্র, সবশেষে যোগ হয়েছে হাঙ্গরের লেজ। আশ্চযের ব্যাপার কি জানেন, প্রানীটির দেহে পযার্প্ত পরিমান আঁইশ থাকলেও আমরা ফুলকারন্ধ্র সনাক্ত করতে পেরেছি। বলতে গেলে বলতে হয়, হাঙ্গর-তিমি-ডলফিন আর আঁইশওয়ালা মাছের সংকর এটি। আশ্চয্য বরই আশ্চযের ব্যাপার। আমার এত বছরের শিক্ষা, শিক্ষকতা ও গবেষনা জীবনে এমন প্রানীর কথা ভাবতেই পারিনি, এ যেন কল্পনা। জায়ান্ট, বিগ জায়ান্ট, অড জায়ান্ট, স্ট্রেঞ্জ জায়ান্ট এন্ড ওয়ান্ডারফুল জায়ান্ট। মি. ববের বক্তব্য শেষ হল।
সত্যিই আশ্চয এক প্রানী, ডাক্তারসাহেব মন্তব্য করলেন। আমিও ওনার সাথে মাথা নাড়ালাম।
স্যার, আমি আর এ্যাডমন্ড প্রানীটির বিবর্তনের ব্যাপারে কিছু আলোচনা করেছিলাম। আপনার এবং ডাক্তার সাহেবের আগ্রহ থাকলে আমি সেগুলো শোনাতে পারি। মি. বব এবং ডা. ক্লিমসন উভয়েই শোনতে আগ্রহ প্রকাশ করলেন।
ও হ্যা, আরেকটি ব্যাপার পাঠকদের জানানো হয়নি, যদিও পাঠকরা হয়ত কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছেন তা হল, ডাক্তার মি. হেনরি ক্লিমসন এবং সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন ভাই। মি. হেনরি বড় আর মি. ডাবরি ছোট। মি. হেনরি এই জাহাজে ডাক্তার হিসেবে আছেন ত্রিশ বছর আর মি. ডাবরি জাহাজে আছেন বার বছর ধরে। মি. ডাবরি অবশ্য প্রথমে শিক্ষানুবিশ হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন, পরে থার্ড মেট এবং তারপর পদোন্নতি হয়ে সেকেন্ড মেট হয়েছেন। ভদ্রলোক বিয়ে করেছেন মাত্র তিনমাস হল। যাই হোক, আমি ওনাদের অর্থাৎ ডাক্তার সাহেব ও মি. ববকে আমার আর এ্যাডমন্ডের আলোচনা শোনালাম।
মি. বব বললেন, আমাদের ধারনার সাথে আপনাদের ধারনা প্রায় মিলে যাচ্ছে। তবে এটা ইউনিক প্রজাতী বা দুর্লভ প্রজাতীও হতে পারে কারন প্রতিনিয়তই বিজ্ঞানীরা নতুন নতুন প্রানীর সন্ধান পাচ্ছেন যারা প্রাকৃতিক এবং কোন ধরনের সংকর প্রজাতি নয়। তারমানে হচ্ছে এই যে, প্রানীটি কোন সংকর প্রজাতি হতে পারে অথবা কোন বিবর্তনের ফলে অথবা নতুন প্রজাতি হতে পারে যা এখন পযর্ন্ত অনাবিষ্কৃত। আপনারা কি বলেন?
ডাক্তার সাহেব বললেন, আপনি যেভাবে কিং চেক দিয়েছেন তাতে আমার আর কি বলার আছে বলুন, কি বল জোসেফ?
নির্ভূল, আমি বললাম।
রাতের খাবারের পর একবার ক্যাপ্টেন মি. কেট বন্ডের সাথে দেখা করলাম। হাসিখুশি চেহারা, আধাপাকা দাড়ি গলা অবধি নেমে এসেছে, চুল প্রায় সব পেকে গেছে-তবে উনি কলপ ব্যবহার করেন, গোফ ছাটা, নিখুত আচড়ানো চুল, হাতে সবসময় দামি ঘরি পড়েন, আয়ত চোখ-শীতল দৃষ্টি, পাতলা ভ্রু, সব মিলিয়ে চেহারাতে কেমন যেন একটা গাম্ভীয্য চলে এসেছে, কথায় স্প্যানিশ টান (জন্মের ব্যাপারে ওনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি হেসে বলেন, ‘আমার জন্ম সমুদ্রের মাঝে, জাহাজে।‘ আর ভাষায় স্প্যানিশ টানের কথা জিজ্ঞেস করায় উনি বলেন, ‘আমি যৌবন পার করেছি স্পেনে।‘) ঢিলে ঢালা পোশাক পড়েন আর ভদ্রলোকের আন্তরিক ব্যবহারের কথাতো আগেই বলেছি। ওনার রুমে যেতেই উঠে দাড়িযে আন্তরিকবাবে হাত মেলালেন (ভদ্রলোক খাটে বসা ছিলেন-হাতের ডায়েরিতে কি সব আঁকিবুকি করছিলেন।)
তারপর মি. পলিন, কেমন কাটল আমাদের জাহাজে আজকের দিনটা? মি. বন্ড জিজ্ঞেস করলেন হাসিমুখে।
অসাধারন, আমি বললাম, আপনার ক্রুরা সকলেই বেশ আন্তরিক। সত্যি কথা বলতে কি, আমি জীবনে অনেক সামুদ্রিক কাহিনী সম্বলিত বই পড়েছি, অনেক নাবিক ক্যাপ্টেনের সাথে আমার পরিচয় আছে তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যক লোকের আচরনেই আমি আন্তরিকতা দেখেছি। অথচ এই জাহাজে এত ক্রু আর সকলেই আন্তরিক-ব্যাপারটি আমার কাছে বেশ আশ্চয লাগছে।
মি. বন্ড আবার হাসলেন, বললেন, আসলে ঘটনা হচ্ছে, আমি সকলকে আনন্দের মধ্যে রাখি। যেমন, প্রতি মাসে একবার করে সকলে ভোজনসহ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পালনের জন্য একত্র হয়, তখন জাহাজ নোঙর করা থাকে, আর যখন ডাঙ্গায় থাকি তখনতো যে যার ইচ্ছে মত আনন্দ করে। যার ফলে ক্রুরা সকলেই উজ্জীবীত থাকে, কাজে ফাঁকি দেয় না। মি. বন্ড এই বলে থামলেন তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, বয়স হয়েছে যার ফলে চাকুরি ছাড়ার জন্য আবেদন করেছিলাম, উদ্দেশ্য বাকী জীবনটা ছেলেমেয়ে নাতিনাতনীদের সাথে কাটাব। সারা জীবনে এ্যাডভেঞ্চার ও টাকা পয়সা তো আর কম আয় করলাম না। কিন্তু বোর্ড সরাসরি রিফিউজ করল। বলল, আপনার যতদিন চলার মত সমর্থ আছে ততদিন জাহাজে থাকবেন, প্রয়োজনে আপনার বেতন দ্বিগুন করা হবে, আর আপনি গেলে ক্রুরা সবাই চলে যাবে।
মি. বন্ড দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, আমার জাহাজ ও ক্রুদের কৃতিত্বের কথা শুনে থাকবেন, বোর্ড ঠিকই বলেছে, আমি চলে গেলে ওরাও সবাই চলে যাবে, কেউ কেউ হয়ত এই পেশাই ছেড়ে দেবে, এসব ভেবে আর যেতে পারলাম না। অবশ্য আমার বেতন দ্বিগুন করা হয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে তো আর ভাবিনা। যাক অনেক কথা বললাম। এখন আপনার কথা বলুন।
আমি হাসলাম, বললাম, আমি যদি আদৌ কোন বই বের করি আর তা যদি কোন গল্প হয় তাহলে সেই গল্পের নায়ক আপনি হবেন। সত্যিই স্যার, আপনার এ্যাডমিনিস্ট্রেশনের কোন তুলনা হয় না। বোর্ড যে আপনাকে ছেড়ে দেয়নি আমার মনে হয় তারা কোন ভুল করেনি, তা না হলে তারা অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলত। অন্তত আমার যা ধারনা। যাই হোক অনেক রাত হল, আজ যাই স্যার, শুভরাত্রি।
মি. বন্ড বললেন, আপনার সাথে কথা বলে যারপরনাই ভালো লাগল, আপনি আবার আসবেন, আর কালতো আবার দেখা হচ্ছে, শুভরাত্রি।
আমি মি. বন্ডের রুম থেকে বেরিয়ে সোজা আমাদের কেবিনে চলে এলাম। দেখলাম ডা. সাহেব এবং এ্যাডমন্ড ইতোমধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে। রুমে অতি অল্প পাওয়ারের একটি বাল্ব জ্বলছে। সেটি না নিভিয়েই আমি শুয়ে পড়লাম।
সকালে ঘুম ভাঙল নাবিকদের হৈ-হুল্লোড়ে। হাতমুখ ধুয়ে ডেক এ উঠে আসলাম। দেখলাম ডা. সাহেব, ক্যাপ্টেন এবং এ্যাডমন্ড রেলিং এর কাছে দাড়িয়ে কথা বলছে। আমি এগিয়ে গেলাম।
এসো এসো, তা ঘুম কেমন হল? ডা. সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
আমি সকলের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে বললাম, খুব ভাল বলব না কারন মানুষের ঘুম খুব ভালোর পযার্য়ে পড়ে না, হয়েছে মোটামুটি ভালই।
তোর লেখকী ভাষা এখানেও ব্যবহার করছিস, নাহ তোকে নিয়ে আর পারা গেল না, এ্যাডমন্ড বলল।
ওর কথায় ডাক্তার, ক্যাপ্টেন দু জনেই হেসে ফেললেন।
আচ্ছা, আমি জানতে চাইলাম, এত হৈ হুল্লোড়ের মানে কী?
ও জানোনা তাহলে, ডা. সাহেব বলতে লাগলেন, মি. উইল আজ ক্রোস নেস্ট থেকে একটি তিমি দেখতে পেয়েছেন, কিন্তু আমরা পৌছানোর আগের সেটি হারিয়ে যায়, তবে এটা খুব ভালো লক্ষন। তিমি দেখার খবর শুনেই নাবিকরা চিল্লাচিল্লি শুরু করল।
পাঠক, মি. উইল ডায়াজ একজন নাবিক। তার কাজ হচ্ছে বাতাসের গতিবিধি লক্ষ্য রাখা এবং ক্রোস নেস্টে বসে থেকে চারপাশে নজর রাখা।
আচ্ছা ডাক্তার সাহেব, আমি বললাম, যদি কিছু মনে না করেন তাহলে কি বলবেন, কি করে আপনার সামনের দাতটি ফেটেছে? এ্যাডমন্ডের কাছে শুনেছিলাম এ ব্যাপারে নাকি একটি চমকপ্রদ ঘটনা রয়েছে।
আমাদের অবাক করে দিয়ে ডা. সাহেব এবং ক্যাপ্টেন একসঙ্গে হেসে উঠলেন। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।
ডা. সাহেব অবশেষে বললেন, তাও ভালো যে এটা তুমি জিজ্ঞেস করেছ, অন্য কেউ এটা জিজ্ঞেস করার সাহসই পায় না। যাই হোক, ঘটনাটি একটু মজার আবার একটু বেদনাদায়কও বটে। ঘটনাটির একমাত্র প্রত্যাক্ষদর্শী হলেন আমাদের ক্যাপ্টেন সাহেব। এজন্যই দুজনে একসঙ্গে হেসে উঠলাম।
আজ থেকে প্রায় সাতাশ বছর আগের কথা, ডা. সাহেব বলতে আরম্ভ করলেন, এই জাহাজে উঠেছি তিন বৎসর হয়, তখন এখানকার মৎস বিজ্ঞানী ছিলেন মি. গিলবার্ট ফরেস্ট। ভদ্রলোক যেমনি সম্ভ্রান্ত ছিলেন তেমনি ছিলেন রাগী। তো প্রথম থেকেই আমার সাথে ওনার অনেক ব্যাপারেই মিলত না, কথা কাটাকাটি হত। আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য বলছি না, ওসব ব্যাপারের কোনটাতেই আমার দোষ ছিল না, ভদ্রলোক এসেই কথার খোঁচা মারতেন আর আমিও সেটা সহ্য করতে পারতাম না। ব্যস শুরু হয়ে যেত বাকযুদ্ধ। এভাবে চলছিল, হঠাৎ একদিন হল কি…….।
দাড়ান দাড়ান, ক্যাপ্টেন ডা. সাহেব কে থামালেন, বাকিটা আমি বলি। মি. পলিন, ক্যাপ্টেন বললেন, একদিন ডাক্তার ও মি. ফরেস্ট ভোরবেলাতেই বাকযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন, তাদের তর্কের বিষয় ছিল তিমির দুধ গরুর বাচ্চাকে খাওয়ানো যাবে কিনা আর সেটা কতটুকু ফলপ্রসু হবে। মৎস বিজ্ঞানীর মত, খাওয়ানো যাবে না আর ডাক্তারের বললেন, খাওয়ালে ক্ষতি নেই। এভাবে চলছিল, একপযার্য়ে ঝগড়াটি হাতাহাতির রূপ নিল। আমি এসে বাধা দেয়ার আগেই দুজনেই পরস্পরের বিপরীতে ঘুসি বিনিময় করে ফেললেন এবং দুজনের টার্গেট নির্ভূল হয়েছিল। ডাক্তারের প্রি-মোলার দাত না ভেঙ্গে ফেটে গেল আর মি. ফরেস্টের সামনের নীচের একটি দাত ভেঙ্গে গেল। এই ঘটনার পর মি. ফরেস্ট চাকুরী ছেড়ে দিলেন, অবশ্য আমারও সে রকমই ইচ্ছে ছিল, কারন ডাক্তারতো ওনাকে পছন্দ করতেনই না, জাহাজের কোন ক্রুই তাকে পছন্দ করত না, আমি নিজেও না। এর প্রধান কারন সম্ভবত ভদ্রলোকের ঝগড়াটে মনোভাব। এই হচ্ছে ঘটনা। ক্যাপ্টেন থামলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, মি. ফরেস্ট এখন কি করছেন বা কোথায় আছেন?
যতটুকু শুনেছি, ক্যাপ্টেন বললেন, তিনি একটি তিমি শিকারী জাহাজে চাকুরী করেন, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেনের সাথে আমার বেশ ভালো জানাশোনা আছে। সেকানে ফরেস্ট সাহেব নাকি এই জাহাজের মতই পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। সেখানে ওনার প্রধান প্রতিপক্ষ জাহাজের আবহাওয়া বিশারদ। যার ফলে চাকুরী সেখানেও যাই যাই করছে। এ নিয়ে কত জায়গায় ওনার চাকুরী গেল তার ইয়ত্তা নেই। তবে লোকটি জ্ঞানী এবং নিজের কাজ সম্পর্কে সচেতন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, এই বলে ক্যাপ্টেন আড়চোখে ডাক্তারের দিকে তাকালেন।
ডাক্তার সাহেব বললেন, সেটা আমিও অস্বীকার করিনা। ভদ্রলোক আসলেই জ্ঞানী, আমিও তর্কের মাধ্যমে অনেক তথ্য ওনার কাছ থেকে জেনেছি।
ওহহো, মনে পড়ার ভঙ্গিতে ক্যাপ্টেন বললেন, মি. পলিন, আপনি নাস্তা করেছেন?
আমি মৃদু হেসে বললাম, এইতো যাচ্ছি স্যার।
ডাক্তার সাহেব বললেন, চলো আমিও নাস্তা করিনি, দু জন একসাথে করি গিয়ে।
ক্যাপ্টেনকে বিদায় জানিয়ে আমরা কেবিনে ফিরে আসলাম।এ্যাডমন্ড সবে খাওয়া শুরু করেছে। আমাদের দুজনকে দেখে বলল, নাস্তা নিশ্চয়ই করা হয়নি, আজ রুটির সাথে সুস্বাদু ঝিনুকের স্টু ও পনির দিয়ে নাস্তা সাড়তে হবে।
আমি আর ডাক্তার সাহেব এ্যাডমন্ডের সাথে যোগ দিলাম। নাস্তা শেষ করেই আমরা তিনজন আবার ডেকে উঠে এলাম। ক্যাপ্টেন চলে গেছেন,তবে আবহাওয়া বিশারদ মি. রবার্ট দ্যানের সাথে দেখা হয়ে গেল। উনি অনেক দূরের ডলফিনের খেলা দেখছিলেন। ভদ্রলোকের চেহারা অনেক মোলায়েম, হাসিখুশি মুখ এবং জাহাজের অন্য সকল ক্রুদের মত তিনিও সদালাপী ও প্রাঞ্জল।
কত সুন্দর প্রকৃতি তাই না, হাস্যোজ্জল মুখে জিজ্ঞেস করলেন মি. দ্যান।
সত্যিই দারুন, মি. দ্যান, আমি উত্তর করলাম।
রৌদ্রোজ্জল চারপাশ, দু চারটা টুকরো টুকরো মেঘ আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে, অ্যালবাট্রসের দল তাদের বিশাল বিশাল পাখা মেলে দিয়ে উড়ে চলছে, সূযের কিরন সমুদ্রের ছোট ছোট ঢেউয়ে প্রতিফলন ঘটাচ্ছে মনে হচ্ছে যেন হাজারো হাজারো হীরে সমগ্র সমুদ্র ব্যাপী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সত্যিই, এটাই একটা জগৎ, এটাই একটা পৃথিবী। যারা এই জগতে বাস করে তারা কতইনা সুখী, কতই না নিশ্চিন্ত।
আমরা চারজন নিজেদের পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে আলাপ করছি এমনই সময় হাজির হলেন ত্রিরত্ন। অর্থাৎ ফার্স্ট মেট মি. সলোমন করিম, সেকেন্ড মেট মি. ডাবরি ক্লিমসন, থার্ড মেট মি. ট্রিমিন সয়েল। ওনারা তিনজনেই আমাদের স্বাগত জানালেন। আমরাও প্রত্যুত্তর করলাম। আশ্চযের ব্যাপার হচ্ছে তিনজন মেট-ই টগবসে যুবক। কারও বয়স তিরিশের বেশি নয়।এত অল্প বয়সে এরূপ দক্ষতা আসলেই প্রশংসনীয়।
মি. সলোমন করিমের চুল বড়, মাথার পেছন দিকে চুল ঘাড় অবদি নেমে এসেছে, কালো রঙের সিল্কি চুল, ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, লম্বা জুলফি, সবার্পেক্ষা আকর্ষনীয় হচ্ছে ওনার চোখ জোড়া। চোখজোড়ায় সাবর্ক্ষনীক যেন কোন বুদ্ধি ঝিলিক দিচ্ছে। দৈহিক গঠন মজবুত, পেটা শরীর, মনে হয় প্রতিদিন ব্যায়াম করেন।
মি. ডাবরি ক্লিমসন দেখতে হুবহু ভাইয়ের মত, শুধু বয়সটা একটু কম এই যা। তবে ওনার হিটলারি গোফ নজরে পরার মত।
থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েল লম্বা, ছিপছিপে শরীর, শ্যামবর্ণ, সোনালী চুলের উচ্ছল যুবক। সবসময় ক্লিনশেভড। ওনার চোখের দিকে তাকালেও মনে হয় উনিও খুব বুদ্ধি ধরেন। তিনজনেরই বাচনভঙ্গি চমৎকার। তিনজনের সাথে খুব বেশি কথা বলার সময় পেলাম না। শুধু জানলাম শীঘ্রই সুখবর আসতে পারে। জাহাজের পেছনে চলে এলাম আমরা।
বাবুর্চি মি. টম হাসিলের মুখ লালচে আলুর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। আগুনের কাছে থাকতে থাকতে মুখে লালচে আভা ধারন করেছে। তবে উনি ফর্সা। একটু বেটে এবং ভুড়িবহুল দেহ। উনি নড়ার সাথে সাথে ওনার ভুড়িটিও নড়ে ওঠে। মাথা ক্লিন শেভড, ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি। দাড়ির রং সোনালী। ছোটছোট চোখ। তবে ওনার মুচকি হাসি দেখতে চমৎকার লাগে। আমাদের চারজনের জন্য উনি চমৎকার কফি বানালেন। জানাগেল এগুলো ব্রাজিলিয়ান কফি। কথা বলতে বলতে কখনযে লাঞ্চের সময় হয়ে এল টেরই পেলাম না। লাঞ্চ করলাম চিংড়ী মাছ ভাজা, চিকেন স্যুপ এবং তিমি মাছের দুধ দিয়ে। তিমি মাছের দুধের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, তিমিরা যখন সমুদ্র সারফেসে উঠে ফোয়ারা ছিটায় তখন বোটে করে জাহাজিরা গিয়ে দুধ নিয়ে আসে। এ এক অনন্য স্বাধ। না খেলে বোঝা যাবে না। লাঞ্চের সময় কেন জানি মনে হল আমাদের অভিযান শেষ হতে আর খুব দেরি নেই।
এভাবেই কেটে যাচ্ছে দিন। জাহাজী, নাবিক তথা ক্রুদের সাথে কথা বলে, আনন্দ ফুর্তি করে উপলব্দি হচ্ছে জীবনটা কতই না উপভোগ্য। একঘেয়েমিয়তা এখানে স্পর্শই করে না। চমৎকার আবহাওয়া, সুস্বাধু খাদ্য, চমৎকার বাসস্থান মোটকথা সবকিছু বিশুদ্ধ। একে একে কেটে গেল তিনটি মাস। টেরই পেলাম না। মনে হচ্ছে এইতো সেদিন এলাম জাহাজে। এখন জাহাজে আমরা কাজ হচ্ছে লেখালেখি করা, ক্রুদের সাথে কথা বলা তাদের জবিনের গল্প ও অভিজ্ঞতার কথা শোনা, প্রকৃতি দেখা, রাতের আকাশের তারা পযবের্ক্ষন করা এবং ক্রুদের সাহায্য করা। এর মধ্যে প্রতিমাসে একবার জাহাজে জলসা হয়। সেটা হয় পূর্নিমার রাতে। জাহাজের ক্রুদের সবাই কিছু না কিছু করে দেখায়। একবারতো হারপুনার মি. জি. ওলমার্ট বাজি ধরে পরপর পাঁচ বোতল রাম সাবার করে দিয়েছিলেন। মাঝে মাঝে নাবিকরা ট্রেজার আইল্যান্ডের সেই বিখ্যাত “মরা মানুষের সিন্দুক” গানটি গেয়ে ওঠে। এই তিনমাসের মধ্যে আমরা অনেক তিমি দেখেছি কিন্তু কোনটির পেছনেই দাওয়া করিনি।কারন আমাদের টার্গেট হচ্ছে “ট্রেঞ্জ ফিস”।
অবশেষে এল সেই দিন। প্রায় সাড়ে পাচ মাসের মাথায় মেঘাচ্ছন্ন একটি দিন। আমরা সবেমাত্র নাস্তা শেষ করেছি এমন সময়ই মি. উইল ডায়াজ ক্রোস নেস্ট থেকে চিৎকার করে উঠলেন। বলতে গেলে তার কন্ঠস্বর কেপে উঠল। জাহাজের সমস্ত ক্রু ডেকে জমা হল।
কি ব্যাপার?
দেখা গেছে, দেখা গেছে, দেখা……………….গে…………ছে, মি. ডায়াজ কোনমতে বলতে থাকলেন, স্যার স্ট্রেঞ্জ ফিস এই মুহূর্তে আমাদের সামনে। মনে হল কথাটি কানে ভুল শুনেছি। ক্যাপ্টেন তড়িঘরি করে ক্রোস নেস্টে উঠে গেলেন। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে রাখলেন পাক্কা পাঁচ মিনিট ছয় সেকেন্ড। অবশেষে নেমে জাহাজ এখানেই নোঙর করার নির্দেশ দিলেন। আমরাও খালি চোখে দেখতে পেলাম জগতের এযাবত কালের মধ্যে সবার্পেক্ষা অদ্ভুত জীবন্ত জীবটিকে। ক্যাপ্টেন স্যার সাথে সাথে ইউএস নেভির সাথে যোগাযোগ করলেন। তারা মাছটিকে জ্যান্ত ধরার চেষ্ঠা করতে বললেন।
ক্যাপ্টেন জানালেন, এটাকে জ্যান্ত ধরা এক কথায় অসম্ভব। সমস্ত দেহ আঁইশে আবৃত এবং প্রতিটি আঁইশে রয়েছে শতাধিক করে সুক্ষ সুক্ষ তীক্ষ্ণ কাঁটা। স্যাটেলাইটের তথ্যাবলীর সাথে বর্ননা হুবহু মিলে গেল। ইউএস নেভির কাছ থেকে প্রাণীটিকে মৃত ধরার নির্দেশ পাওয়া গেল। হারপুনাররা তাদের হারপুনে ধার দেয়ার তোরজোর শুরু করলেন। ক্যাপ্টেন তো প্রত্যেক হারপুনারের জন্য জনপ্রতি দশ হাজার ইউএস ডলার করে পুরস্কারের ঘোষনা দিলেন যদি কাজটি ঠিকমত সমাধা করতে পারে।
চারজন হারপুনার, ছয়জন জাহাজী, নাবিক মি. উইল ডায়াজ ও মি. হুয়ান কিম, থার্ডমেট মি. ট্রিমিন সয়েলসহ সবমিলিয়ে ষোলজন লোক চারটি বোটে করে “স্ট্রেঞ্জ ফিস” অভিমুখে যাত্রা করল। হারপুনাররা সদা সতর্ক। এগিয়ে থাকা প্রথম বোটে রয়েছে সবচেয়ে অভিজ্ঞ হারপুনার মি. বিলি মেন। সবাই তার নির্দেশের অপেক্ষা করছে। অবশেষে চারজন হারপুনার একসাথে তাদের অস্ত্র ছুড়লেন। অব্যর্থ লক্ষ্যভেদ। চারজনের হারপুনই প্রানীটির মাথায় আঘাত করেছে। প্রথম তিনসেকেন্ড কিছুই ঘটল না। তারপর হঠাৎ করেই প্রানীটি সমুদ্র জলে ডুব মারল। হারপুনাররা তাদের হারপুনে কোন ধরনের টানই অনুভব করল না।
সেই যে গেল, গেলই। এই ঘটনার পর আরও ছয়মাস আমরা একে খুঁজে বেড়ালাম। কিন্তু বৃথা। ক্যাপ্টেনের নির্দেশে আমরা ফিরে চললাম। জেটিতে আমার ছেলেমেয়েরা, তাদের মা, এ্যাডমন্ডের শ্বশুর ও স্ত্রী উপস্থিত ছিল। আমরা সবাই আমার বাড়িতে এসে উঠলাম। বাচ্চারাসহ বড়রা আমাদের দুজনকে ঝেকে ধরল সব শোনার জন্য। আমরাও ধৈয্য ধরে সব শোনালাম। ঘটনার পর আজ প্রায় পাঁচ বছর কেটে গেছে, এর মধ্যে একটি বারের জন্যও আর দেখা যায়নি স্ট্রেঞ্জ ফিসকে। এ্যাডমন্ড ফিরে গেছে সমুদ্রে। ওদের ঘরে এসেছে ফুটফুটে একটি ছেলে। হয়ত সেও বাবার মত তিমির পেছনে ধাওয়া করবে। স্ট্রেঞ্জ ফিসের দেহটি ছিল জেলি ফিসের মত থলথলে তাই হারপুনে কোন টান পড়েনি।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন সামুদ্রিক কল্পকাহিনী : ওটা কী ছিল?
টোকাই ছেলে
টোকাই ছেলে
মেহেদী হাসান
মেহেদী হাসান
হারানো দিনের গল্প
মনে আছে অল্প
সেই গল্পের কথা মনে করে
মন প্রান দু:খে যায় ভরে
এইতো আমার জীবন।
সবখানেতেই যাতনা
ছড়িয়ে আছে কতনা
এই অভাগার জন্য
প্রকৃতি হয়নি ধন্য
এইতো আমার জীবন।
আমাকে বানানোর ভুল
প্র্রকৃতি পাচ্ছেনা কূল
তার হচ্ছেনা কোন লাভ
কি করব কি করব ভাব
এইতো আমার জীবন।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন টোকাই ছেলে
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত কবিতা
এইতো আমার জীবন
এইতো আমার জীবন
মেহেদী হাসান
মেহেদী হাসান
হারানো দিনের গল্প
মনে আছে অল্প
সেই গল্পের কথা মনে করে
মন প্রান দু:খে যায় ভরে
এইতো আমার জীবন।
সবখানেতেই যাতনা
ছড়িয়ে আছে কতনা
এই অভাগার জন্য
প্রকৃতি হয়নি ধন্য
এইতো আমার জীবন।
আমাকে বানানোর ভুল
প্র্রকৃতি পাচ্ছেনা কূল
তার হচ্ছেনা কোন লাভ
কি করব কি করব ভাব
এইতো আমার জীবন।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন এইতো আমার জীবন
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত কবিতা
এতিমের আজাহারি
এতিমের আজাহারি
মেহেদী হাসান
মেহেদী হাসান
পৃথিবীতে আমি একজন
আমি একজন মানুষ।
আমি সবার মতই
সবার মত জীবন আছে আমারও।
সবাই খায়, আমিও খাই।
সবাই ঘুমায়, আমিও ঘুমাই।
সবাই হাসে, আমি কাঁদি।
সবার যা আছে
আমারও আছে তা।
কিন্তু হায়! আমি ভুলে গেছি
আমারত একটা জিনিস নেই।
নেই যা, তা আমার
সবচেয়ে আপন, পরম প্রিয়
কি তা, বলব?
সে আমার মা।
আমার মা নেই।
এই নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে
সবাইকে ছেড়ে
আমাকে ছেড়ে
পাড়ি জমিয়েছেন
অনন্ত জীবনের পথে।
ওগো মা, তুমি আমাকে
রেখে গেলে কার কাছে?
কে আমাকে আদর দেবে?
কে আমাকে স্নেহ দেব?
কে আমাকে করবে আশীর্বাদ?
কেউ নেই, কেউ নেই।
কারন, মা তো একটাই হয়।
মায়ের ছাড়া অন্য কারও মুখে
আমি খুজে পাই না।
মা তুমি কেন গেলে
আমাকে একা রেখে?
কেনই বা তোমার পূর্বে
আমি গেলাম না?
সেকি আমার দুর্ভাগ্য?
হায়বে অভাগার ভাগ্য।
পৃথিবীর সকল সুখী মানুষদের
আমি বলব উচ্চস্বরে
দেখ, দেখ তোমরা
এক অভাগকে, এক এতীমকে।
যার মা তাকে ছেড়ে
চলে গেছে অজানার পথে।
যার মা নেই তার সব বৃথা।
মা নেই তো কিছুই নেই।
হে পৃথিবীর সুখী মানুষেরা
হাসো তোমরা দেখে আমাকে
এক অভাগকে, এক এতীমকে
যার কাছে মার স্নেহ
মার আদর, মার আশীর্বাদ
সবই অবিশ্বাস্য, সবই কল্পনা।
প্রিয় বন্ধুরা, এই বাংলা ব্লগ-এ আপনারা পড়ছেন এতিমের আজাহারি
Tag :
আমার লেখা,
স্বরচিত কবিতা













